২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ‘প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা’ ও ‘বাস্তবসম্মত ভিত্তির’ বড় ধরনের অভাব রয়েছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, বাজেটের প্রাক্কলনগুলো বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, সরকার একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার থেকে বাজেটে শুল্ক ছাড় ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো ভালো কিছু প্রস্তাব দিলেও, সেগুলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সুশাসনের অভাব বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।
ভিত্তিহীন প্রাক্কলন ও শৃঙ্খলার অভাব
ড. মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, বাজেট প্রাক্কলনের জন্য যে ভিত্তি ধরা হয়েছে, তা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রপ্তানি, রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি খাতের ঋণে একটি বৈপ্লবিক ও অলৌকিক পরিবর্তন আসবে ধরে নিয়ে আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যেখানে ঋণাত্মক (-১.৮%), সেখানে আগামী বছর ৮.৭% প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। এই দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেট প্রাক্কলন করা বাজেটের শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও ঋণের ঝুঁকি
বাজেটে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বাড়তি সম্পদ আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। ড. মোস্তাফিজুর বলেন, এক বছরের মধ্যে এই বিশাল রাজস্ব আদায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। যদি রাজস্ব আদায় কম হয় এবং সরকারি ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের বড় লক্ষ্যমাত্রা এবং তা পরিশোধের চাপ সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অবকাঠামো
কেবল শুল্ক ছাড় বা বিশেষ সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ বা নীতিগত সুবিধার চেয়েও গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। তার মতে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সংস্কারের বিষয়ে বাজেটে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই।
এসএমই ও কর্মসংস্থান
প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের জন্য বন্ড সুবিধা ও ব্যাংক গ্যারান্টির মতো কিছু ইতিবাচক প্রস্তাব রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাতে হলে বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। এছাড়া কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, কেবল অভ্যন্তরীণ বাজার নয়, বরং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বৈদেশিক শ্রমবাজারে পাঠানোর ওপরও বিশেষ নজর দেওয়া দরকার, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও শক্তিশালী করবে।
সিপিডি মনে করে, বাজেটের সফল বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, একটি ভালো বাজেট পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও তা সাধারণ মানুষের কল্যাণে আসবে না।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রস্তাবিত এই বাজেট সরকারের প্রথম বাজেট। এই বাজেটটি এমন সময়ে দেওয়া হয়েছে যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে এবং গত প্রায় চার বছর থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুর্বল ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান হচ্ছে না, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে এবং ব্যাংকিং খাত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মোটামুটি অবস্থায় রয়েছে, প্রেসারে ছিল কিন্তু মোটামুটি ভালো হয়েছে। তবে এখন ক্রিটিক্যাল হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তর্নিহিত দর্শন হলো মানব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিপিডির মতে, বাজেটের এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নের বিষয়গুলোতে মিল রয়েছে। তবে বাজেটের সাফল্য আকারের ওপর নয়, বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি।
সিপিডি বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলছে, বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যেগুলো দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং জনগণের কাছে দৃশ্যমান ফলাফল পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বাজেট নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শনের এটিই সরকারের প্রথম বড় সুযোগ। বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার যদি কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে সিপিডি।




