এবার কৃষকের চোখের পানি ঝরাচ্ছে পেঁয়াজ উৎপাদন খরচ মণপ্রতি ১৬০০ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকায়

0
9

বীজের অস্বাভাবিক দর, সার, কীটনাশক, ডিজেল, সেচ, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় মৌসুমের শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় পেঁয়াজ চাষিরা। সব মিলিয়ে পেঁয়াজ চাষে এবার কৃষককে গুনতে হয়েছে সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ খরচ। মাঠে বাম্পার ফলন হলেও এখন বাজারে সেই পেঁয়াজ বেচতে গিয়ে চাষির মন বেজার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। কোথাও কোথাও ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়ও নেমে এসেছে।

অথচ কৃষকের দাবি, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, মূলধনও তুলতে পারছেন না কৃষক। রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, কুষ্টিয়া ও রাজশাহীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চাষিরা এখন হতাশ। অনেক কৃষক বলছেন, এভাবে লোকসান চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে আর পেঁয়াজ চাষ সম্ভব হবে না।

পেঁয়াজ বাজারে ধসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে।

ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার ক্ষোভে নিজের উৎপাদিত পেঁয়াজ নদীতে ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন এক কৃষক। বালিয়াকান্দির ইসলামপুর ইউনিয়নের হলুদবাড়িয়া গ্রামের কৃষক পলাশ মিয়া গত মঙ্গলবার সোনাপুর বাজার-সংলগ্ন সেতু থেকে হড়াই নদীতে কয়েক বস্তা পেঁয়াজ ফেলে দেন। পরে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পলাশ মিয়া জানান, এই মৌসুমে তিনি ১০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন। ফলনও হয়েছে ভালো। তবে বাজারে গিয়ে যে দাম পাচ্ছেন, তাতে উৎপাদন খরচও উঠছে না। তিনি বলেন, মাঠ থেকে তোলার সময় কিছু পেঁয়াজ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মণ বিক্রি করলেও এখন তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। অথচ এক মণ পেঁয়াজ ঘরে তুলতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। তিনি জানান, যেদিন পেঁয়াজ নদীতে ফেলেন, সেদিন বাজারে আনা পেঁয়াজ ছিল বি-গ্রেডের। কোনো ব্যবসায়ীই সেই পেঁয়াজের ন্যায্য দাম বলতে রাজি হননি। ক্ষোভ ও হতাশা থেকেই তিনি চার মণ পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দেন।

আরেক কৃষক অজি উল্যাহ বলেন, এবার এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদনে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সার, জ্বালানি তেল, শ্রমিকসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। যারা লিজে জমি নিয়েছেন, তাদের খরচ আরও বেশি। বর্তমান বাজারদরে পেঁয়াজ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ ওঠানো সম্ভব নয়। কৃষক আবুল কাশেম বলেন, উৎপাদনে লোকসানের পাশাপাশি সংরক্ষণ খরচও বাড়ছে। পেঁয়াজ যাতে পচে না যায়, সে জন্য বাড়িতে ফ্যান চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুতের বিলও দ্বিগুণ। তার পরও পচন ঠেকানো যাচ্ছে না।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরের একই চিত্র। বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হাজারো কৃষক লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফরিদপুর সদরের কানাইপুরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, এ বছর উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর পেঁয়াজ বাজারে আসছে। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণেই দাম কমে গেছে।

ফরিদপুরের সালথার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, বীজ, সার, কীটনাশক, ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরি আকাশছোঁয়া। অথচ ফসল বিক্রি করতে গেলে কোনো দাম নেই। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি গরুর মাংস কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজশাহীতে রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও বাজারদর নিয়ে কৃষকের হতাশার শেষ নেই। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও হাইব্রিড জাতের ব্যবহার বাড়ার কারণে উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। পুঠিয়ার বানেশ্বর হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক আব্দুল মমিন বলেন, গত ২০ বছরে আমি এমন বাজারদর দেখিনি।

কৃষকের তথ্য অনুযায়ী, নিজের জমিতে প্রতি বিঘা পেঁয়াজ চাষে খরচ হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। আর লিজ নেওয়া জমিতে এ খরচ ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়। শুধু জমির ভাড়াই বিঘাপ্রতি প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। দেশীয় মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে ওঠার সময় আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে চলে আসায় স্থানীয় উৎপাদকরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩১ লাখ ৪০ হাজার ৬৯০ টন। আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৪২ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে দেড় লাখ টন।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া, চাষের বিস্তার এবং হাইব্রিড জাতের ব্যবহার বাড়ার কারণে উৎপাদন বেড়েছে। তবে সেই অতিরিক্ত উৎপাদনই এখন বাজারে মূল্য পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফরিদপুর মসলা গবেষণা উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, মাঠ থেকে তোলার সময় বৃষ্টির কারণে এ বছর পেঁয়াজে বেশি পচন ধরেছে। হাইব্রিড পেঁয়াজে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় সংরক্ষণের সময় দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। অনেক কৃষক নিজে বীজ উৎপাদন করায় বিভিন্ন জাত মিশে যাচ্ছে। ফলে কোন পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ ২৮ থেকে ৩০ টাকা। বাজারদর যদি এর নিচে থাকে, তাহলে কৃষকের ক্ষতি হবেই।

রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন,  বৃষ্টি ও নিম্নমানের বীজের কারণে জেলায় উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৫ শতাংশ নষ্ট হয়েছে। কৃষকের কাছে পেঁয়াজ থাকা অবস্থায় যাতে আমদানি করা না হয়, বিষয়টি কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নাঈম আহম্মেদ বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই দর নির্ধারিত হয়। তবে কৃষকের ক্ষতি কমাতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন এবং টিসিবির মাধ্যমে সরাসরি পেঁয়াজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পরিচর্যা শাখার পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, পেঁয়াজ সারাবছর ব্যবহৃত হলেও সবাই একসঙ্গে বিক্রি করতে গেলে বাজারদর কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই উৎপাদনের পরপরই পুরো খরচ উঠে আসবে, এমন প্রত্যাশা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, বাজারমূল্য নির্ধারণের বিষয়টি কৃষি বিভাগের হাতে নেই। আমরা কৃষকের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকি। সরকার কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। আমরা পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ারফ্লো মেশিন পেঁয়াজ চাষিদের সরবরাহ করেছি। পেঁয়াজ সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম সতর্ক করে বলেন, পেঁয়াজ বাজারের এই ধস শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও ধাক্কা। কারণ হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পেঁয়াজ চাষের ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের হাতে টাকা না থাকলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাঁর মতে, সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পেঁয়াজ কেনা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here