ভারী বৃষ্টি ও ঢল চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে বন্যার অবনতি, রান্নায় সংকট

0
5

কোলে ১১ মাসের শিশু। ডান হাতে ছাতা ধরেছেন। হাঁটুপানি ভেঙে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছেন রকিবুল ইসলাম। পেছনে পেছনে যাচ্ছেন স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা। গতকাল শনিবার চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মনকিচর এলাকায় হাঁটুপানিতে ডুবে থাকা সড়কে দেখা যায় এই দৃশ্য। রকিবুল জানান, তাদের বসতঘরে ঢুকেছে বন্যার পানি। রান্নাঘর তলিয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া নেই। বাড়িতে থাকার আর সুযোগ নেই। তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন।

একই সড়কে আরেকটু সামনে যেতেই দুই যুবক ও এক কিশোরের দেখা মেলে। তাদের মাথায় ও হাতে পানির কলসি। যুবক রাজ্জাক আলী বলেন, তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি।

খাবারের সংকট। তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। খাবার পানির সংকট। এ কারণে এক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করেছেন। কলসিতে পানি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন। সেখানে মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান রয়েছেন।

কিশোর আক্কাস বলে,  সে তার বাবা-মায়ের জন্য এই খাবার পানি সংগ্রহ করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে দুই দিন ধরে সবাই শুকনা খাবার খাচ্ছে। কোনো খাদ্য সহযোগিতা পায়নি তারা।

তাদের মতো খাদ্য ও পানির সংকটে ভুগছেন সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার বানভাসিরা।  এখানে অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি। তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। কক্সবাজারের দুটি উপজেলায়ও বন্যার অবনতি হয়েছে। সেখানেও দুর্গতরা শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। পানির সংকট তীব্র। বান্দরবান সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে দাবি করছেন বানভাসিদের অনেকে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকা গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন। মোবাইল টাওয়ারগুলো অচল হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকার মানুষরা যোগাযোগ করতে পারছেন না।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা স্পিডবোট ও লাইফ জ্যাকেট নিয়ে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছেন। উদ্ধারকাজ সুশৃঙ্খল করতে সেনাবাহিনী তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। বাঁশখালীর চেচুরিয়া এলাকায় ঘরের ভেতর আটকে পড়া এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশুসহ ১৩ জনের একটি পরিবারকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করেছেন।

গতকাল সরেজমিন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জলদী সদর, শীলকুপ, গন্ডামারা বাহারছড়া ও শেখেরখিল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চলাচলের প্রধান সড়কের কোথাও কোমর, কোথাও হাঁটুপানি। এলাকার পর এলাকা পানিতে ডুবে আছে। যেসব এলাকায় গত শুক্রবার পানি ওঠেনি, সেসব ঘরবাড়িতে ঢুকতে শুরু করেছে পানি। তাই মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন।

হাঁটুপানির নিচে থাকা গন্ডামারা সড়কে কথা হয় রাশেদ আলী নামে এক ব্যক্তি সঙ্গে। তিনি বলেন, সময় যত বাড়ছে, বন্যার পানি ততই বাড়ছে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়ি যাচ্ছেন। শুক্রবার শুকনা খাবার খেয়ে রাত কাটিয়েছেন। বিশুদ্ধ পানি শেষ হয়ে গেছে।

বাহারছড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে এক শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। তাকে কবর দেওয়ার জন্য শুকনা জায়গা খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট হয়েছে। আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে পুকুরপাড়ে একটি উঁচু এলাকায় তাকে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।’

বাঁশখালীর পূর্ব ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ১২টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তারা গত বৃহস্পতিবার রাতে এসেছে। এখনও প্রশাসনের কেউ তাদের খবর নেয়নি। খাদ্য সহযোগিতা পাননি। সবচেয়ে বড় সংকট বিশুদ্ধ পানির। পাঁচ কিলোমিটার দূরের দোকান থেকে পানি কিনে খেতে হচ্ছে।

সেখানে আশ্রয় নেওয়া সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাড়ি থেকে চাল-আলু নিয়ে এসেছিলাম। খাওয়া শেষ। এখন মুড়ি খেয়ে আছি। এক গ্লাস করে পানি খাচ্ছি। আমার মতো অন্যরাও খাবার কষ্টে আছেন।’

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি ত্রাণের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল ও আড়াই হাজার পরিবারে শুকনা খাবার বিতরণ করেছি। আজ থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়েছে।’

সাতকানিয়ায়ও বন্যার পানি কমছে না। দুই উপজেলায় প্রায় আট লাখ মানুষ পানিবন্দি। মূলত বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকার পানি নেমে আসায় বন্যার পানি কমছে না। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২১ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত এলাকায় ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রতিনিধি জানান, সাতকানিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের কোনোটির পুরো অংশ, আবার কোথাও আংশিক পানিতে ডুবে রয়েছে। উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কেও যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। লোহাগাড়া সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে।

পাহাড়ি ঢলের পানির তীব্র স্রোতে একটি সেতু ধসে পড়ে রাঙ্গুনিয়া হয়ে বান্দরবানের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সেতুর দুই পাশে আটকা পড়েছে হাজারো যাত্রী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গতকাল শনিবার ভোরে উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া একটি রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির চাপ আরও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে পানির তোড়ে সেতুটির একটি অংশ ভেঙে পড়ে। কর্ণফুলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার লিচুবাগান এলাকা থেকে নদীর অপর পারে চলাচলকারী ফেরি সার্ভিসও বন্ধ রয়েছে। ফলে বিকল্প পথেও বান্দরবানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে বন্যার পানি কিছুটা কমলেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বাড়িঘর, উঠান ও গ্রামীণ সড়কে হাঁটুপানি জমে আছে। কৃষিজমি ও পুকুর তলিয়ে রয়েছে। ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

ফটিকছড়িতে দুর্গত মানুষের পাশে সেনাবাহিনী
বন্যায় ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে সড়কযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় শত শত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

গতকাল গুইমারা রিজিয়নের অধীন লক্ষ্মীছড়ি জোনের উদ্যোগে উপজেলার সুন্দরপুর, হারুয়ালছড়ি ও আশপাশের বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেনাসদস্যরা নৌযান ও অন্যান্য উপায়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০টি পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ত্রাণ তুলে দেন।

দুই মন্ত্রীর দিনভর তৎপরতা
বন্যাকবলিত মানুষের পাশে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। গতকাল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রয়েছে। সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য রোগব্যাধি প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

সার্কিট হাউসে পৃথক এক সভায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, খাল-নালা দখল ও জলপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতার কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাঁশখালীর সব স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে।

কক্সবাজার
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্যায় চকরিয়া উপজেলার অধিকাংশ এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ উপজেলার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নে বাড়িঘরের পাশাপাশি ডুবে গেছে স্কুল, কলেজ, ইউনিয়ন পরিষদ। এ দৃশ্য শুধু লক্ষ্যারচরের নয়। উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

এভাবে পানিবন্দি কক্সবাজার জেলার ৪০টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ লাখ বাসিন্দা। তবে, বৃষ্টি কিছুটা কমায় কোথাও কোথাও নামতে শুরু করেছে পানি। তবে, অধিকাংশ এলাকার মানুষ এখনও পানিবন্দি।

লাক্ষ্যারচর ইউনিয়নের বন্যাদুর্গতের দাবি, প্রায় এক সপ্তাহ পানিবন্দি হয়ে থাকলেও এখনও পৌঁছায়নি খাদ্য সহায়তা। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে ভুগছেন তারা।

ভোক্তভোগীরা জানান, বহু নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির উৎস অচল হয়ে পড়েছে। ঘরে বুকসমান থেকে কোমরপানি। তাই রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। প্রকট হয়ে উঠছে শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও।

চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন বলেন, তিন দিন ধরে পানিবন্দি। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারও পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে যা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা অতি সামান্য।

মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা মকবুল আহমদ বলেন, বন্যার পানিতে বসতঘর ডুবে গেছে। চুলা ধরানোর সুযোগ নেই। অসংখ্য মানুষ না খেয়ে আছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষ হাহাকার করছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলায় ৩০ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৪০০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কাছে ত্রাণসহ বিভিন্ন ধরনের জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে বন্যাদুর্গত পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলা পরিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণকালে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন।

রাঙামাটি
রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় ফারুয়া ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সেখানে অন্তত ২০টি গ্রামের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের শিলক সেতু ধসে পড়ায় দুই জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

গতকাল বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে পানি বেড়েছে। এতে ১১ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রাইখ্যং নদীর প্রবল স্রোতের কারণে এই ইউনিয়নের কয়েক হাজার দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

রাজাস্থলী-বিলাইছড়ি সীমান্ত সড়ক উদয়চর এলাকায় ধসে পড়ায় বড় যানবাহন চলাচল করছে না। উপজেলায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন জানান, নদীতে প্রচণ্ড স্রোতের কারণে উপজেলা সদর থেকে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় বাজার থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হয়েছে।

বান্দরবান 
বান্দরবানে বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ধস ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল সকাল থেকে জেলা শহরের সঙ্গে রাঙামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া-চন্দ্রঘোনা এবং রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বান্দরবান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন।

শহরের বন্যার পানিতে সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকার কোথাও কোথাও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এবং গাছ পড়ে থাকায় বান্দরবান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

খাগড়াছড়ি
দীঘিনালা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষজন বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে। এদিকে প্রায় চার দিন বন্ধ থাকার পর দীঘিনালা-লংগদু সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গতকাল সকাল থেকে মাইনী নদীর পানি কমে যাওয়ায় দীঘিনালার নিচু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করে। উপজেলার মেরুং বাজারের পানি অনেকটাই নিচে নেমে গেছে। ধীরে ধীরে বাজারের সবকিছু স্বাভাবিক হচ্ছে।

১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলার উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় সমকালকে এ তথ্য জানান আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি এবং এ বিভাগের অধীনে আলিম এবং এইচএসসি ভোকেশনাল, বিএমপি, ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বন্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৭ নির্দেশনা
দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে সাত দফা জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিকেল টিম গঠন, জরুরি ওষুধ ও স্যালাইনের পর্যাপ্ত মজুত, অ্যান্টি-ভেনম সরবরাহ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যু বেড়ে ৪৪
বন্যা ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাতটি জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। এসব জেলায় ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সৃষ্ট এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাত জেলার ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ।

হবিগঞ্জে বিশুদ্ধ পানির সংকট
হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় নদীভাঙনে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৩০টি গ্রাম। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। বানভাসিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে।

মৌলভীবাজারে দুর্ভোগ বেড়েছে
মৌলভীবাজারে নদনদীর পানি কমতে শুরু করায় পরবর্তী দুর্ভোগ বেড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার অনেক স্থানে বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে গোখাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অনেক এলাকার মানুষকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here