মেয়াদ পূরণের এক বছর ৯ মাস আগে গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। গতকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র পৌঁছে দেন তিনি। তা গ্রহণ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার।
পরে সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়ে হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি (মোঃ সাহাবুদ্দিন) মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন সব সময়। আমি তাঁর মঙ্গল কামনা করি।’
পদত্যাগের মধ্য দিয়ে মেয়াদপূর্তির আগে দায়িত্ব ছাড়া অষ্টম রাষ্ট্রপতি হলেন মোঃ সাহাবুদ্দিন। এ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ, ভারপ্রাপ্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে আসীন হওয়া ১৮ ব্যক্তির মধ্যে ১০ জনই নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছেড়েছেন। এর মধ্যে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় দুজন রাষ্ট্রপতি নিহত হন। আর আটজন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে পদত্যাগ করেন বা অপসারিত হন।
রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি বিএনপি। তবে জামায়াতে ইসলামী একে স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরে যাওয়া বলে আখ্যা দিয়েছে। আর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদ্য পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই ছাত্র নেতৃত্ব মোঃ সাহাবুদ্দিনের অপসারণ দাবি করেন। এতে সমর্থন দেয় জামায়াতসহ কয়েকটি দল। তবে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা দেখিয়ে বিএনপি এর বিরোধিতা করেছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গঠিত বিএনপি সরকারের প্রতি সমর্থন জানান মোঃ সাহাবুদ্দিন। গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে পদে পদে অপমান করেছে। বিএনপির সরকারের সময় ভালো আছেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রপতিকে বিদেশ যাওয়া এবং বঙ্গভবন থেকে খুব একটা বের হওয়ার সুযোগ না দিলেও, বিএনপির সময় চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান মোঃ সাহাবুদ্দিন। গত ঈদুল আজহার নামাজে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল কোলাকুলির ছবিও দেখা যায়।
অবশ্য বিএনপি সূত্র আগেই নিশ্চিত করেছিল, জুলাই নাগাদ বিদায় নিতে হবে রাষ্ট্রপতিকে। আগামী সংসদ নির্বাচনের সময় কে বঙ্গভবনে থাকবেন– এ হিসাব করেই সংসদ সংগঠনের পরও কয়েক মাস সময় দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে।
এখন সংবিধান অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। তবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার। এই সময়ে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
কে হবেন বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর ১৯৯১ সালে একাধিক প্রার্থী হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একবারই সংসদের কক্ষে ভোট করতে হয়েছিল। পরে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এবারও দলটির মনোনীত ব্যক্তির পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়া নিশ্চিত।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, তারা তপশিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শিগগির এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মোঃ সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন থেকে বিদায়ের প্রস্তুতি নিলেও রাজধানীর শাহবাগসহ কয়েকটি স্থানে গতকালও মিছিল-সমাবেশ হয়েছে তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবিতে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ইস্যুতে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তবে এক প্রতিক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা এটিকে (রাষ্ট্রপতি পদ) একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখি। আমরা দেখেছি তিনি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তিনি আমাদের সরকারকে সহযোগিতা করেছেন।’
জুলাই অভ্যুত্থানের আগে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘তিনি যেহেতু স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাই সেই সময়কার কিছু সমালোচনা ছিল।’ ‘তবে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে ৫ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সংকটের সময়ে রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক পথে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার,’ উল্লেখ করেন তিনি।
সবকিছুই বিধি অনুযায়ী হয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এখন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’
সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতিকে যাতে চিকিৎসার নামে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাহাবুদ্দিনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পদত্যাগের পর সাহাবুদ্দিনের আর আইনগত দায়মুক্তি নেই। তাই তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ব্যাংক লুটসহ সব অভিযোগ তদন্ত করে বিচার করতে হবে।
বঙ্গভবন সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মোঃ সাহাবুদ্দিন। গুলশানে তাঁর নিজ বাসায় প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে নিরাপত্তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, পদত্যাগের পরও সাবেক রাষ্ট্রপতি আজীবন পেনশন, চিকিৎসা সুবিধা, প্রটোকল পাবেন।
আওয়ামী লীগ মনোনীত মোঃ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের ২৩ এপ্রিল। এই সময়ের মধ্যে তিনি তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন।
শারীরিক ও মানসিকভাবে অসমর্থ
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, তিনি (সাহাবুদ্দিন) গুরুতর অসুস্থ। বিভিন্ন রোগের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেছেন।
স্পিকার আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। তাঁর হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যান। রোগগুলোর প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোঃ সাহাবুদ্দিন।
এক প্রশ্নের জবাবে হাফিজ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি গুরুতর ঘটনা। এর সঙ্গে দেশের ভালো-মন্দও জড়িত। রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ, তিনি অসুস্থ হতেই পারেন এবং তিনি রোগেরও নাম প্রকাশ করেছেন। লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তিনি কী কী রোগে ভুগছেন এবং মাঝেমধ্যে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এ জন্য ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, এই পদত্যাগের ফলে সব ধোঁয়াশা পরিষ্কার হলো।’
পদত্যাগপত্রে যা লিখলেন রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্রে বলেন, ‘আমি মোঃ সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ৫ আগস্ট ২০২৪ সনে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।’
পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’
পদত্যাগপত্রের বাকি অংশে নিজের অসুস্থতার বিবরণ তুলে ধরেন সাহাবুদ্দিন। যা পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সংবাদ সম্মেলনে জানান।
লালমোহনে আনন্দ মিছিল
দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নিজ সংসদীয় আসন ভোলার লালমোহনে আনন্দ মিছিল করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। গতকাল রাত পৌনে ৮টার দিকে উপজেলা বিএনপি আয়োজিত মিছিলটি দলীয় কার্যালয় থেকে বের হয়ে উপজেলা শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে চৌরাস্তা মোড়ে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।




