শিল্প নয়, চা হোক কৃষিপণ্য

0
2

চা উৎপাদনকে ‘কৃষি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স। একই সঙ্গে ভ্যাট ও কর কমানো, স্বল্পসুদে ঋণ, বিশেষ সহায়তা তহবিল, রপ্তানি সম্প্রসারণ, পুনঃরোপণ কর্মসূচি, শ্রমিক কল্যাণসহ একগুচ্ছ সংস্কার সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স।

জানা গেছে, আজ রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাশিল্পের উন্নয়নে একটি বিশেষ বৈঠক ডেকেছেন। বৈঠকে টাস্কফোর্সের সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

গত জুনে দেশের চাশিল্পের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো, বিশ্ববাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ডিং গড়ে তোলা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। ন্যাশনাল টি কোম্পানির চেয়ারম্যান মামুন রশীদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৫ সালে দেশের ১৭২টি চা বাগানে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এ খাতে সরাসরি ১ লাখ ৪২ হাজার শ্রমিক কর্মরত। এ ছাড়া প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ চা বাগান এলাকায় বসবাস করেন এবং সারাদেশে লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চা দোকান এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে চা বিক্রি হওয়ায় সংকট গভীর হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন খরচের নিচে চা বিক্রি হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ২৬০ টাকা। অথচ নিলামে গড় বিক্রিমূল্য ছিল ২০৮ দশমিক ৮৮ টাকা। ২০০২ সালের তুলনায় দেশের চা রপ্তানি প্রায় ৭৯ শতাংশ কমে গেছে।

প্রতিবেদনে সংকটের পেছনে ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চা খাতকে ‘কৃষি’ নয়, ‘শিল্প’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত থাকা। এর ফলে চা বাগানগুলো কৃষিখাতের স্বল্পসুদে ঋণ, ভর্তুকিযুক্ত সার ও শস্য বিমার সুবিধা পাচ্ছে না। কৃষিঋণের সুদ ৬ শতাংশ হলেও চা বাগানগুলোকে ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। কৃষির মতো ৬ শতাংশ হারে সুদে পেলে এ খাতে বছরে ৬১৭ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

এ ছাড়া ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ১ শতাংশ বিশেষ কর, ১ শতাংশ ব্রোকারেজ, গুদামজাতকরণ ব্যয় এবং সরাসরি বিক্রির ওপর অগ্রিম আয়করের চাপ ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের চায়ের ওপর আরোপিত ভ্যাট বিশ্বের প্রধান চা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। রপ্তানি পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বার্ষিক রপ্তানি আয় নেমে এসেছে মাত্র ২৫ থেকে ৪৫ লাখ মার্কিন ডলারে। পাকিস্তান ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো রপ্তানি বাজার নেই। পাশাপাশি বাংলাদেশের চায়ের কোনো জাতীয় ব্র্যান্ড কিংবা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) নিবন্ধনও হয়নি।

প্রতিবেদনে উৎপাদনশীলতার ঘাটতিকেও বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১ হাজার ৫৫০ কেজি, যা ভারত ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক কম। অনেক বাগানে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত গাছ অনুপস্থিত এবং মাটির জৈব উপাদানের পরিমাণও কম। এ ছাড়া চা বাগানের মোট ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪২ একর জমির প্রায় ৪৫ শতাংশে চা উৎপাদন হয় না। এর মধ্যে সীমিত অংশ নতুন বাগান তৈরির উপযোগী হলেও বাকি জমি পর্যটন, সৌরবিদ্যুৎ বা উচ্চমূল্যের কৃষিকাজে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।

সংকট কাটিয়ে উঠতে টাস্কফোর্স ৫৯টি সুপারিশের মধ্যে ১০টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চা খাতকে কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানো, ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন এবং গুণগত মানভিত্তিক তিন স্তরের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ। এছাড়া ১০ বছর মেয়াদি পুনঃরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, পাকিস্তান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সঙ্গে সরকারিভাবে রপ্তানি চুক্তি, বিডায় ‘টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ স্থাপন, গ্রিন ফিন্যান্সের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ও আধুনিক সেচে বিনিয়োগ, পঞ্চগড়ে চা বোর্ডের আঞ্চলিক অফিস স্থাপন এবং শ্রমিকদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে বাধ্যতামূলক কল্যাণ কর্মসূচির আওতায় আনা।

প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ৯০ দিনের কর্মপরিকল্পনাও দেওয়া হয়েছে। প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, ৬০ দিনের মধ্যে চাকে কৃষি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করার নির্বাহী আদেশ এবং ৯০ দিনের মধ্যে রপ্তানি আলোচনা, বিডায় বিনিয়োগ ডেস্ক ও পঞ্চগড়ে আঞ্চলিক অফিস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

মামুন রশীদের নেতৃত্বে প্রস্তুত করা এই প্রতিবেদনে চাশিল্পকে শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, বরং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা সংশ্লিষ্ট একটি কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here