হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হয়েছে কিনা, তা যাচাই করতে দেশব্যাপী গবেষণা শুরু করেছে সরকার। আগস্টের মাঝামাঝি গবেষণার ফল প্রকাশ হওয়ার কথা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরুর পর শুধু জুলাই মাসে হাম ও এই ভাইরাসের উপসর্গে ১১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০ হাজার ২০৯ জন। এখনও প্রতিদিন নতুন করে প্রায় এক হাজার শিশু শনাক্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর প্রথমে ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ৮ এপ্রিল ঢাকার দুটি এবং বরিশাল ও ময়মনসিংহ– চার সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল থেকে তা সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হয়।
এদিকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের দাবি, ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে ১০৩ শতাংশ অর্জন করা হয়েছে। কিন্তু একই বয়সী শিশুদের জন্য পরিচালিত জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই কোটি ২৬ লাখ। অর্থাৎ, দুই কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখ শিশুর ব্যবধান রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ব্যবধানই প্রমাণ করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, হাম এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বর্তমানে আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাবঞ্চিত অথবা অপুষ্টিতে ভুগছে। তিনি বলেন, টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ভুল ছিল এবং প্রায় ৪৬ লাখ শিশু কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেছে। তিনি জানান, হাম পরিস্থিতি পর্যালোচনায় নতুন বৈঠক করা হবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার মূলত টিকাদান কর্মসূচির ওপর নির্ভর করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু রোগী শনাক্তকরণ, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল প্রস্তুতি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পদক্ষেপে ঘাটতি ছিল।
হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ে জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, শুধু টিকাদান নয়, কভিড-১৯ মহামারির সময়ের মতো সামাজিক সংক্রমণ প্রতিরোধে শুরু থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। জ্বর দেখা দিলে শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, হাত ধোয়ার অভ্যাস, মাস্ক ব্যবহার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মতো উদ্যোগ যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি।
টিকা নিয়েও হামে আক্রান্ত
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন আরাফাত সাজিদের বয়স তিন বছর দুই মাস। ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির আওতায় দুই ডোজ এমআর টিকা নেওয়ার পাশাপাশি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতেও সে টিকা পেয়েছিল। এর পরও গত ১৯ জুলাই হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সাজিদের মা সুমি আক্তার বলেন, ছেলে জন্মের পর থেকে সুস্থ ছিল। সময়মতো সব টিকা নিয়েছে। দুই বছর বুকের দুধ খেয়েছে এবং প্রাদুর্ভাবের সময় প্রয়োজন ছাড়া বাইরে নেওয়া হয়নি। তার পরও সে আক্রান্ত হলো।
একইভাবে ১০ মাস বয়সী হাফসাও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা পেয়েছিল। কিন্তু জ্বর, কাশি ও পরবর্তী জটিলতায় তাকে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি।
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী বলেন, টিকা নেওয়ার পর শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে অ্যান্টিবডির মাত্রা যাচাই করা উচিত। তাঁর মতে, অন্তত ১২০ আইইউ/এমএল অ্যান্টিবডি থাকলে শিশুকে নিরাপদ ধরা যায়। এর কম হলে পুনরায় টিকা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেরোলজিক্যাল পরীক্ষা করা হলে বোঝা যাবে টিকার কার্যকারিতা কতটা হয়েছে এবং পুনরায় টিকাদানের প্রয়োজন রয়েছে কিনা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যে কোনো টিকাদান কর্মসূচির পর টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়নে গবেষণা ও নজরদারি (পোস্ট মার্কেটিং সার্ভিলেন্স) পরিচালনা একটি বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআর,বি– যে কোনো প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের মূল্যায়ন করতে পারে। এতে দেখা হয়, টিকা নেওয়ার পর কত শতাংশ মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি কতটা কার্যকর হয়েছে। শুধু টিকাদান নয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কৌশল এখন সময়ের দাবি।
এনভিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান সমকালকে বলেন, টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশুর অপুষ্টি, মায়ের অপুষ্টি, ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি, অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত থাকা এবং মায়ের পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়া। তিনি বলেন, তিন-চার বছর ধরেই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি– এমন শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর প্রবণতা বাড়ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানান, দেশের ১৮টি উপজেলা থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হচ্ছে। আগস্টের মাঝামাঝি গবেষণার ফল প্রকাশ করা হবে। তখন বোঝা যাবে, টিকা নেওয়ার পর কত শতাংশ শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।




