এলডিসি উত্তরণের পথনকশা তৈরি, ১৪ সূচকে নজরদারি

0
7

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে টেকসই, মসৃণ ও স্থিতিশীল উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে সরকার ২০২৬ থেকে ২০২৯ সময়ের জন্য একটি জাতীয় রোডম্যাপ বা পথনকশার খসড়া তৈরি করেছে। উত্তরণ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছর বাড়ানোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়নের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অধীনে একটি ড্যাশবোর্ড চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে অর্থনীতি ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত ১৪টি প্রধান কর্মক্ষমতা সূচক (কেপিআই) নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত অন্তত ৯ শতাংশে উন্নীত করা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়ে অন্তত ছয় মাসের সমপরিমাণে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ। ২০২৯ সালের মধ্যে এটি ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ওপরে নেওয়া, তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানির অংশ অন্তত ২৫ শতাংশে উন্নীত করা, কনটেইনার খালাসের গড় সময় ১০ দিন থেকে কমিয়ে ১-২ দিনে নামিয়ে আনা এবং সব সরকারি ব্যবসায়িক সেবা শতভাগ ডিজিটাল ও সমন্বিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৩০ লাখ অতিরিক্ত দক্ষ শ্রমিক তৈরি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ১৫ শতাংশে উন্নীত করা, ব্যবসা অনুমোদনের সময় কমানো, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি, সরকার স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ইএসজি বা পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন মানদণ্ড অনুসরণকারী রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়েও নজর রাখা হবে।
সরকারের মতে, উত্তরণের সময় তিন বছর বাড়ানোর আবেদন কোনোভাবেই উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট ও পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করা। এ কারণে রোডম্যাপের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, উৎপাদনশীলতা ও শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উত্তরণ-পরবর্তী বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সুশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কূটনৈতিক তৎপরতা
বাংলাদেশ এর আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানায়। গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেন। পরে সিডিপি প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন নীতিগতভাবে সমর্থন করলেও সময়সীমা উল্লেখ করেনি। একইভাবে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠিয়েছে।
এ অবস্থায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে গত ১৪ থেকে ১৮ জুলাই বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তর সফর করে। সফরকালে প্রতিনিধি দল সিডিপির চেয়ারম্যান, ইকোসকের সভাপতি ও সহসভাপতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল এবং জি-৭৭ ও চায়না গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির লক্ষ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়; বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত সময় নিশ্চিত করা। বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারও বাংলাদেশকে একটি বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক সংস্কার রোডম্যাপ উপস্থাপনের পরামর্শ দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইআরডি  রোডম্যাপের খসড়া প্রস্তুত করেছে।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি তদারকির জন্য সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত সপ্তাহের বৈঠকে অংশীজনের মতামত নিয়ে রোডম্যাপ চূড়ান্ত করে জাতিসংঘ ও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।

চার ধাপে সংস্কার কর্মসূচি
তিন বছর মেয়াদি সংস্কার কর্মসূচিকে চারটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপ ‘কুইক উইন অ্যাকশন’ জুন ২০২৭-এর মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। এ সময় খেলাপি ঋণ আদায়ের কাঠামো তৈরি, ব্যাংকের চাপ সহনশীলতা পরীক্ষা, সাত দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদান, ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর করা এবং জাতীয় ইএসজি কমপ্লায়েন্স ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়নের কাজ শেষ হবে।

দ্বিতীয় ধাপে ২০২৮ সালের মধ্যে এনবিআরের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, কর জাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কর ব্যবস্থা চালু, অলাভজনক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, কর-বহির্ভূত রাজস্ব বৃদ্ধি, টেকনোলজি মডার্নাইজেশন ফান্ড গঠন এবং এপিআই পার্ক কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত ওষুধ, আইসিটি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও চামড়া শিল্পে বিশেষ সহায়তার মাধ্যমে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বন্দর দক্ষতা বাড়িয়ে কনটেইনার খালাসের সময় দুই দিনের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শেষ ধাপে ২০২৯ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে উত্তরণের আগে সামগ্রিক অগ্রগতি মূল্যায়ন, বাকি সংস্কার সম্পন্ন এবং চূড়ান্ত প্রস্তুতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

বেসরকারি খাতের জন্য ১৫ কর্মপরিকল্পনা
পুরো উত্তরণ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকে প্রধান বাস্তবায়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে ১৫টি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে শিল্পে অটোমেশন, ডিজিটাল ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রযুক্তি ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে রপ্তানি ভ্যালু চেইনে যুক্ত করতে প্রযুক্তি সহায়তা কেন্দ্র গঠন। এ ছাড়া রয়েছে বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, কার্বন নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ এবং টেকসই ব্যবসায়িক প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে ইএসজি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা; আইএলওর শ্রমমান, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও জেন্ডার সমতা বাস্তবায়ন; শিক্ষানবিশ, রি-স্কিলিং ও আপ-স্কিলিং কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি; এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্সভিত্তিক শিল্প কারিকুলাম চালুর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন রপ্তানি বাজারে প্রবেশ; উচ্চমূল্যের পণ্য, নিজস্ব ব্র্যান্ড ও উন্নত প্যাকেজিংয়ে গুরুত্ব দেওয়া; উৎপাদনশীলতা ও জ্বালানি দক্ষতার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ; ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর সঙ্গে সংযুক্ত ডিজিটাল ইনভেন্টরি ব্যবস্থা চালু; কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ও সবুজ বিনিয়োগ বাড়ানো মতো পরিকল্পনা বেসরকারি খাতের জন্য রয়েছে। এ ছাড়া  নীতিগত সংস্কারে সরকারকে প্রমাণভিত্তিক মতামত প্রদান; শিল্প পার্ক, লজিস্টিক হাব, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কোল্ড-চেইনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। ২০২৯ সালের শেষে চূড়ান্ত সক্ষমতা মূল্যায়ন করে উত্তরণ-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়নে সরকারকে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।

পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে ইআরডি সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত ‘জাতীয় এলডিসি মনিটরিং অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন কমিটি’ পুরো রোডম্যাপ বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে এবং কৌশলগত নির্দেশনা দেবে। এ ছাড়া ‘পাবলিক-প্রাইভেট সেক্টর টাস্ক ফোর্স’ গঠন করা হবে, যা নীতিমালার বিভিন্ন ত্রুটি চিহ্নিত করে আইনি সংস্কারের সুপারিশ করবে।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার সমকালকে বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও বাণিজ্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের অগ্রগতি খুবই সীমিত। অথচ উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। সে বাস্তবতায় টিকে থাকতে বাণিজ্য ও শুল্ক ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, উত্তরণের জন্য দুই বছর হোক বা তিন বছর— যে অতিরিক্ত সময়ই বাংলাদেশ পাবে, প্রস্তুতি জোরদারের জন্য তা হবে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এ সময়কে কাজে লাগাতে সরকারের উচিত দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা, সুনির্দিষ্ট ও মনিটরিংযোগ্য বাস্তবায়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করা এবং এর অগ্রগতি দৃশ্যমান করা। এতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের আবেদন ইতিবাচকভাবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here