গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরে আসতে সরকার চাপ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দাবি থেকে সরে আসতে লোভ দেখানো হয়েছে, চাপও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু লোভ, চাপ ও ভয় দেখিয়ে জনগণের গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে একচুলও সরাতে পারবে না। প্রয়োজনে জীবন যাবে তবুও জনগণের সঙ্গে সরকারের মতো বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না, করবও না।
গতকাল বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে গণসমাবেশে এসব কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। দলটির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য এই সমাবেশ আয়োজন করে। এতে জোটের বিভিন্ন দলের হাজারো নেতাকর্মী অংশ নেন। তারা গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি জানান। জুলাই গণহত্যা, আগের দিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের বিচারের দাবি জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান সরকারের উদ্দেশে বলেন, আপনারা যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন, আমাদের তো অস্থিরতার কোনো কারণ ছিল না। দেশের বারোটা বেজে যাবে আর আমরা বসে বসে আঙুল চুষব– এটা হবে না।
সরকারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, সব দেখে মনে হচ্ছে, আরেকটা অনিবার্য বিপ্লব আসন্ন। এই বিপ্লবের জন্য আমি আপনাদের সবাইকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
জামায়াত আমির বলেন, জুলাই আন্দোলনে যেমন শিশু থেকে বৃদ্ধ–সব বয়সী মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন, তেমনি ভবিষ্যতের যে কোনো আন্দোলনেও মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেবে। জনগণের রায়কে যারা অপমান করেছে, তাদের সবাইকেই অপমানজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে।
শিক্ষাঙ্গনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও পুরোনো দখলদার রাজনীতি ও ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সংকট তৈরি করে পরে মূল্যবৃদ্ধিকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বের কৃতিত্ব তরুণ প্রজন্মের। দেশবাসীর জীবন ও রক্তের ফসল জুলাই গণঅভ্যুত্থান। কোনো ব্যক্তি বা দল একক কৃতিত্ব দাবি করলে, জাতি ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করবে।
বিরোধী জোটের সক্রিয়তা সম্পর্কে শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা (সরকার) বলছেন, মাত্র ৫ মাসে আমরা (বিরোধী দল) এত ব্যস্ত হলাম কেন? তাদের পাল্টা প্রশ্ন কর, মাত্র ৫ মাসে আপনারা এত বিশ্বাসঘাতকতা করলেন কেন? কেন ফ্যাসিবাদের ফটোকপি হিসেবে আবির্ভূত হলেন? এ জন্যই আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অলি আহমদ বলেন, কয়েক মাস ধরে আমি বারবার প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি বিভেদ সৃষ্টি না করতে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন না, যেখান থেকে আপনাদের পতন শুরু হবে। মঙ্গলবার দেশের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা প্রমাণ করে আপনার দলের ভেতরেই এমন লোক রয়েছে, যারা আপনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায় না। আপনার দলের নেতারা আপনাকে পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি নিয়ে ছাত্রদলের আপত্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকে আপনার দলের নেতারা আমাকে রাজাকার
বানাচ্ছে। আপনার মা খালেদা জিয়া জামায়াতের সমর্থনে ১৯৯১ সালে সরকার গঠন করেছেন। ২০০১ সালে সরকার গঠন করেছেন। তাহলে কী তিনি রাজাকার ছিলেন?
মামুনুল হক বলেন, ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জালিমকে জুলুম থেকে বিরত রাখাই তাকে সাহায্য করার প্রকৃত উপায়। তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, তারা যেন অতীতের সহিংস ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির পথ থেকে ফিরে আসে। অন্যথায় জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, জামায়াত আমির লন্ডন চুক্তির অংশ হননি। তিনি আজ জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েও সেখানে না গিয়ে রাজপথে জনতার কাতারে এসে হাজির হয়েছেন। জামায়াত আমির দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংস্কারের পরিবর্তে সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ না দিয়ে।
মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আজকের বিএনপি খালেদা জিয়ার বিএনপি নয়। এই বিএনপি আপসকামী বিএনপি। শেখ হাসিনার পথে যাত্রা শুরু করেছে। বিএনপি যদি হাসিনার পথেই হাঁটতে থাকে, প্রয়োজনে আমরা আবারও গুপ্ত হব। তবুও গণভোটে জনগণের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি আদায় করবই।




