প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফর জামায়াত সামলাতে হেফাজতকে কাছে টানার কৌশল বিএনপির হেফাজতের আমিরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক আজ

0
3

বিগত সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছিল হেফাজতে ইসলাম। এমনকি প্রকাশ্যে বিএনপিকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম বলেও জানিয়েছিলেন সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। জামায়াত ইস্যুতে হেফাজতের এই অবস্থান বিএনপির জন্য নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। নির্বাচনের পরও জামায়াতবিরোধী অবস্থান ধরে রেখেছে হেফাজত।

এমনকি হেফাজতে থেকেও নির্বাচনে জামায়াত জোটে যাওয়া খেলাফতে মজলিস নেতা মামুনুল হকসহ অনেক সিনিয়র নেতাকে সংগঠনে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। এটি বিএনপি-হেফাজতকে আরও কাছাকাছি এনেছে। নানা ইস্যুতে জামায়াত জোট যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তখন হেফাজতকে আরও কাছে টানছে বিএনপি। এটিকে অবশ্য জামায়াতকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

আজ রোববার দিনব্যাপী চট্টগ্রাম সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন, চট্টগ্রামে বন্যাদুর্গত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং দলীয় একটি সভায় অংশ নেবেন তিনি। তাঁর এই সফরের সব ছাপিয়ে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হেফাজতের আমির শাহ আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়টি।

আজ দুপুর ২টায় ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় তাদের এই সাক্ষাৎ হবে। মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসাটির মুহতামিম পদে দায়িত্ব পালন করছেন। মাদ্রাসাটি থেকে হেফাজতের কার্যক্রমও পরিচালনা করেন তিনি। হাটহাজারীর ওই মাদ্রাসায় যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চিরসমাহিত হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবরও জিয়ারত করবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে হেফাজত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত যেসব মামলা এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি, সেগুলো প্রত্যাহার চাইবেন মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। একই সঙ্গে ধর্মীয় ইস্যুতে হেফাজতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কওমি মাদ্রাসা পরিচালনায় সহযোগিতাও আশা করেন হেফাজতের নেতারা।

হেফাজতের তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন ইস্যুতে হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে তিনশ মামলা করা হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার হেফাজত নেতাকর্মীদের এসব মামলার বড় একটি অংশ প্রত্যাহার করে নেয়। পরবর্তীকালে বিএনপি সরকার আমলেও বেশ কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়।

তবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফর করেন। ভারতে মুসলিম নিপীড়নের অভিযোগে হেফাজতে ইসলাম ও বিভিন্ন সমমনা দল তাঁর এই সফরের বিরোধিতা করলে বিভিন্ন এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় হাটহাজারী, মুন্সীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় দায়ের হওয়া দুই ডজনের বেশি মামলা এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি। এর বাইরে আরও কিছু মামলা রয়েছে। এগুলো প্রত্যাহার চায় হেফাজতে ইসলাম।

এ ব্যাপারে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা আজিজুল হক ইসলামাবাদী সমকালকে বলেন, আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী শুধু হেফাজতে ইসলামের আমিরই নন; তিনি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের একজন বুজুর্গ আলেম ও মুরব্বি। তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে নতুন ইতিহাস রচিত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে এ জন্য হেফাজতের পক্ষ থেকে আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। দুজনের সাক্ষাতে স্বাভাবিকভাবে হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এখনও যেসব মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি, সেগুলো প্রত্যাহারের বিষয়টি আসবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় ইস্যুতে হেফাজতের অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

আদর্শিক কারণে দেওবন্দি ধারার হেফাজতে ইসলাম স্পষ্টতই মওদুদী আদর্শে পরিচালিত জামায়াতের ঘোরবিরোধী। জামায়াতের এই আদর্শিক বিরোধিতাকে আরও কাজে লাগাতে চাইছে বিএনপি। নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করে দলটি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের আগে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হেফাজত আমিরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি। এবার খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে খোঁজ-খবর নিতে ফটিকছড়ি যাচ্ছেন। বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে জামায়াতসহ সমমনা দলগুলো।

এ ব্যাপারে গত নির্বাচনে ফটিকছড়ি আসন থেকে নির্বাচন করা চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যক্ষ নুরুল আমিন সমকালকে বলেন, হেফাজতের পক্ষ থেকে জামায়াতের বিরোধিতাকে আকিদাগত বলা হলেও এর নেপথ্যে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও রয়েছে। বিএনপি এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাবে– এটাই বাস্তবতা।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম যেসব সমালোচনা করে, সেগুলোকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করি; উপদেশ হিসেবে নিই। কোথাও সংশোধনের বিষয় থাকলে সেটিও করা হয়ে থাকে। আমরা আশা করছি, তাদের সঙ্গে আমাদের যে দূরত্ব, সেটি ধীরে ধীরে কেটে যাবে।

তবে নাম প্রকাশ না করে চট্টগ্রাম জামায়াতের এক সিনিয়র নেতা জানান, হেফাজতের কার্যক্রম হচ্ছে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। এগুলো মানুষের দানের টাকায় পরিচালিত হয়। বিনা খরচে শিক্ষার্থীদের খাওয়ানো ও পড়ানো হয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আসে বেশির ভাগ টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তাদের টাকার উৎসে টান পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন তারা সরকারের সঙ্গে আরও সুসম্পর্ক বাড়াতে চায়। বিএনপিও এটিকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে। এটি জামায়াতকে এক ধরনের চাপে রাখার কৌশলগত ষড়যন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু নয়।

তবে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হেফাজতের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এবং নির্বাচনে তারা আমাদের সমর্থন দিয়েছে। এই সম্পর্কের টানেই প্রধানমন্ত্রী হেফাজতের আমিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। এ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে ১৩ দফা দাবি আদায়ে আয়োজিত সমাবেশের মাধ্যমে প্রথম জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে হেফাজত। সমাবেশটি অবরুদ্ধ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সেই কর্মসূচিকে সমর্থন দিলে বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের সুসম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। তবে পরবর্তীকালে মামলা-মোকদ্দমা ও ধরপাকড় এড়াতে তাদের একটি অংশ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে বাধ্য হয়। তবে এখন সেই অংশটি নিষ্ক্রিয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here