একটি টার্মিনাল চালু হয়েছে, আরেকটি বন্ধ। ফলে মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট এখনও কাটেনি। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বন্ধ থাকা সামিট এলএনজি টার্মিনাল গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে। এর আগেই গতকাল বিকেল ৪টার দিকে কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে গেছে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল। রাত ১০টা পর্যন্ত সেটি চালু হয়নি।
সামিটের সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ানোর কথা। গতকাল দিবাগত রাত ২টার দিকে তা প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছানোর আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে গ্যাসের ঘাটতি কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু এক্সিলারেট কখন চালু হবে, তা নিশ্চিত নয়। ফলে সামিট চালু হওয়ার পরও গ্যাসসংকট কতটা কমবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
গত কয়েক দিনের সংকটের পেছনে শুধু বৈরী আবহাওয়াই নয়, সামিটের টার্মিনালে একটি এলএনজি কার্গো গ্রহণ না করার ঘটনাও বড় ভূমিকা রেখেছে। সৌদি আরামকোর পাঠানো ‘আলহামরা’ কার্গোটি মহেশখালীর সামিট টার্মিনালে যুক্ত করা হয়নি। টার্মিনাল কর্তৃপক্ষের দাবি, কার্গোটি পুরোনো হওয়ায় জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল। তাই কার্গোটি গ্রহণ না করে ফেরত পাঠানো হয়।
তবে পেট্রোবাংলার একটি সূত্র বলছে, ওই জাহাজে ২০২১ সালের দিকে এলএনজি নেওয়া হয়েছিল। ফলে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে কার্গোটি সামিটের টার্মিনালে যুক্ত করা গেলে গত দুই-তিন দিনের গ্যাস সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ সেই ঝুঁকি নেয়নি।
আরামকোর কার্গোটি ফিরে যাওয়ায় সামিটের মজুত এলএনজি দিয়েই কয়েক দিন সরবরাহ চালাতে হয়। মজুত কমে আসায় সোমবার সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ কমানো শুরু হয়। মঙ্গলবার ২০ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত দেওয়া হয় মাত্র ১০ কোটি ঘনফুট। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সামিটের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
গতকাল ভিটল এশিয়ার একটি এলএনজিবাহী জাহাজ সামিটের টার্মিনালে যুক্ত হয়। এই কার্গো যুক্ত হলেও তা থেকে টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহ শুরু হতে সময় লাগে। তবে গতকাল রাতের মধ্যেই এই সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা।
এদিকে কার্গো যুক্ত হওয়ার পর টার্মিনাল তার মজুত করে রাখা এলএনজি থেকে সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে জাতীয় গ্রিডে অল্প অল্প করে গ্যাস দেওয়া শুরু করে সামিট।
সামিটে নতুন কার্গো যুক্ত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ার আশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই স্বস্তি পুরোপুরি মিলছে না।
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ৬ আগস্ট একটি বয়লার দিয়ে সীমিত পরিসরে সরবরাহ শুরু হয়েছিল। টার্মিনালটির দুটি বয়লারের প্রতিটির সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট। ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি পুরো সক্ষমতায় চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। এজন্য পুরো টার্মিনাল প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। সেই প্রস্তুতির মধ্যেই শুক্রবার বিকেলে আবার কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। রাত ১০টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারেনি এক্সিলারেট।
ফলে সামিটের সরবরাহ বাড়লেও জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রত্যাশামতো বাড়বে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বিশাল
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট।
সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে ১৯০ থেকে ২০০ কোটি ঘনফুটের ঘরে। বৃহস্পতিবার সামিট বন্ধ হওয়ার পর সরবরাহ প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে নেমে যায়।
সামিট পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে কিছুটা ঘাটতি কমবে। অন্যদিকে এক্সিলারেট বন্ধ থাকায় সেই সুবিধার একটি অংশ আবার কমে যাবে। তাই শনিবার সামিটের সরবরাহ ৫৫ কোটি ঘনফুটে উঠলেও দেশে গ্যাসের ঘাটতি থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুটি টার্মিনাল একসঙ্গে স্বাভাবিকভাবে চালু না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী স্বস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তার ওপর নতুন কার্গো সময়মতো আসা এবং সমুদ্রের আবহাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুতেও ভোগান্তি
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ সচল রাখতে গ্যাস দেওয়ায় অন্যান্য খাতে জোগান কমেছে। ফলে গ্যাসের সংকটের সঙ্গে বিদ্যুতের ভোগান্তিও যুক্ত হয়েছে।
তবে শুক্রবার বৃষ্টি ও ছুটির দিনের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম ছিল। ফলে আগের কয়েক দিনের তুলনায় লোডশেডিং কম হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিডের হিসাবে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৮২০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ২০ মেগাওয়াট। রাত ৮টার দিকে চাহিদা বেড়ে ১৫ হাজার ৬৭৩ মেগাওয়াট হলে লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ২১১ মেগাওয়াটে।
এর আগের দিনগুলোতে ঘাটতি ছিল অনেক বেশি। ৯ আগস্ট সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট, ১০ আগস্ট তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট এবং ১১ আগস্ট তিন হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবারও সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল দুই হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট।
নারায়ণগঞ্জে শুক্রবারও কয়েক দফা লোডশেডিং হয়েছে। সিলেটেও গত কয়েক দিনে ৩৫ থেকে ৬৮ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। গাজীপুরে অবশ্য শুক্রবার বেশির ভাগ শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল সামান্য।
রাজধানীতে চুলা জ্বলছে না
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাসাবাড়িতে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। কোথাও সকাল থেকে চুলা জ্বলছে না, কোথাও রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলা, রাইস কুকার কিংবা মাটির চুলা ব্যবহার করছে। কিন্তু গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও স্বস্তি মিলছে না; কারণ সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে।
উত্তরা, মিরপুর, আগারগাঁও, রামপুরা, মালিবাগ, মগবাজার, বাড্ডা ও পুরান ঢাকার বাসিন্দারা গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
পাম্পে দীর্ঘ লাইন
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিতে হচ্ছে। কোথাও ভোররাত থেকে অপেক্ষা করেও কয়েক ঘণ্টা পর গ্যাস মিলছে। আবার অল্প পরিমাণ গ্যাস নিয়েই ফিরতে হচ্ছে চালকদের।
হাজীপাড়া এলাকায় শুক্রবার ভোরে ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এক পাশের সারি প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে কেউ ১৭৯ টাকার গ্যাস পেয়েছেন, কেউ আবার ১০০ থেকে ২০০ টাকার বেশি গ্যাসও পাননি।
সিলেটেও একই চিত্র। বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি গ্যাস না পেয়ে চালকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও সড়কে যানবাহন আড়াআড়ি রেখে প্রতিবাদ করায় তীব্র যানজট হয়েছে, আটকে পড়েছে অ্যাম্বুলেন্সও।
চাঁদপুরে ছয়টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে কয়েকটিতে শুক্রবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। হাজীগঞ্জে গ্যাস না পেয়ে চালকরা সড়ক অবরোধ করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বুধবার থেকে গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের পাশাপাশি পাঁচটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও ১৭টি গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
পরিবহনেও বাড়তি ভাড়া
গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে যাত্রী পরিবহনে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মোগরাপাড়া থেকে মদনপুরের স্বাভাবিক ভাড়া ২০ টাকা, কিন্তু এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কাঁচপুরের ৩০ টাকার ভাড়াও বেড়ে ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
চালকদের ভাষ্য, ফিলিং স্টেশনে তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অনেক গাড়ি রাস্তায় নামানোও সম্ভব হচ্ছে না।
কুমিল্লার হোমনা ও মেঘনাতেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহনে। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা এবং ৩০ টাকার ভাড়া ৬০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।




