অর্থাভাবে থমকে তিন মেধাবীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন

0
2

অদম্য ইচ্ছা আর কঠোর অধ্যবসায়ের কাছে হার মেনেছে দারিদ্র্য। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানো’ সংসারে থেকেও এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে কেশবপুরের তিন অদম্য মেধাবী ছাত্রী– সুমি খাতুন, তানিয়া নাসরিন ও হাজিরা আক্তার মিতু। তারা উপজেলার পাঁজিয়া ইউনিয়নের গড়ভাংগা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। তবে এই অর্জনের আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বিষাদ। চরম অর্থকষ্টে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।

২০ কিলোমিটার হেঁটে চূড়ায় সুমি
সুমি খাতুন মনিরামপুর বাঙালীপুর গ্রামের দিনমজুর আব্দুস সাত্তারের মেয়ে। পাঁচ সদস্যের সংসার আর তিন বোনের লেখাপড়ার খরচ চালাতে গিয়ে তার বাবাকে হিমশিম খেতে হয়। অর্থাভাবে স্কুলে যাতায়াতের জন্য গাড়ি ভাড়া বা সাইকেলের সংস্থান হতো না সুমির। দিনে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ হেঁটে সে স্কুলে যাতায়াত করেছে।

সুমি জানায়, বেলকাটি গ্রামে নানা বাড়িতে থেকে সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। কিন্তু সপ্তম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় নানা মকছেদ গাজী মারা যান। তখন ১০ কিলোমিটার দূরের নিজ বাড়িতে ফিরতে হয় তাকে। শত কষ্টেও স্কুল ছাড়েনি সে। বিজ্ঞানে জিপিএ ৫ পেলেও সুমির দুশ্চিন্তা, কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে।

অসুস্থ বাবার দুশ্চিন্তা ঠেলে তানিয়ার জয়
তানিয়া নাসরিন ও হাজিরা আক্তার মিতুর বাড়ি ব্যাসডাঙ্গা গ্রামে। তাদের এলাকা বছরের প্রায় আট মাসই জলাবদ্ধ থাকে। প্রতিদিন কাদাপানি মাড়িয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেত তারা।

তানিয়ার বাবা আবুল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, তবু ভ্যান চালিয়ে পাঁচজনের সংসার আর দুই মেয়ের পড়ার খরচ মেটান। বড় বোনের বিয়ে হলেও মেজ বোন কলেজে পড়ে, ঘরে রয়েছেন অসুস্থ দাদিও। শত অভাবের মধ্যেও জিপিএ ৫ পেয়েছে তানিয়া। তবে অসুস্থ বাবার চোখে এখন একটাই দুশ্চিন্তা– মেয়ের স্বপ্নের পথে বাধা পেরুবেন কীভাবে?

মায়ের সঙ্গে বিলে মাছ ধরে মিতুর সংগ্রাম
মিতুর গল্পটি আরও বেশি সংগ্রামময়। দিনমজুর বাবা হোসেন আলীর সামান্য আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চলা দায় ছিল। বাধ্য হয়ে মিতুর মা শরীফা বেগম জলাবদ্ধ এলাকায় মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসারের হাল ধরেন। বন্ধের দিনগুলোতে মিতুও মায়ের সঙ্গে বিলে নেমে মাছ ধরত।

পানিতে কায়িক শ্রম দিয়ে যার কৈশোর কেটেছে, সে আজ বিজ্ঞানে জিপিএ ৫ পেয়ে চমক লাগিয়ে দিয়েছে। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি দারিদ্র্যকে হার মানালেও উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো নিয়ে সে এখন শঙ্কিত। এই তিন জয়িতার সাফল্যের হাসি আজ মলিন হওয়ার পথে।

গড়ভাংগা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপ্রভাত বসু বলেন, ‘সুমি, তানিয়া ও মিতু আমাদের প্রতিষ্ঠানের গর্ব। স্কুল থেকে সাধ্যমতো তাদের সহায়তা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। এ কারণে আমরাও এখন তাদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তিত। সমাজের দানশীল ও বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে এই অদম্য মেধাবীরা দেশের সম্পদ হয়ে উঠবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here