চুন কারখানার বিষে ধুঁকছে ছাতক

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী চুন শিল্প এখন স্থানীয় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ধরনের ছাড়পত্র ছাড়াই পৌর এলাকাসহ উপজেলার নদীতীরবর্তী এবং ছাতক-সিলেট ও ছাতক-দোয়ারাবাজার সড়কের পাশে স্থানীয় প্রশাসনকে উপেক্ষা করে গড়ে উঠেছে দুশতাধিক অবৈধ চুনের কারখানা। স্থানীয় ভাষায় যা পাজু নামে পরিচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় দিন দিন এসব অবৈধ পাজুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিকে জনবল সংকটে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অপারগতার কথা জানিয়েছে বন বিভাগ।

চুন উৎপাদনে যে অননুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, তাতে বাতাসে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হচ্ছে। এ ছাড়া অতিমাত্রায় ক্ষারীয় উপাদান নিঃসৃত হচ্ছে কারখানার পানি ও অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে, যা ক্ষয় রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটাচ্ছে। কার্বনের বিষে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসজনিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একই সঙ্গে চুনের পাজুতে জ্বালানি হিসেবে নির্বিচারে কাঠ পোড়ানোর ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এসব কারখানা কেবল মূল সড়কের পাশেই নয়, বরং গ্রামীণ বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের

কাছাকাছি গড়ে তোলায় শিক্ষার্থীরাও চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।
জানা যায়, একেকটি চুল্লিতে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার ৪০০ টন কাঠ পোড়ানো হয়। এতে একদিকে যেমন এলাকায় জ্বালানি কাঠের সংকট দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে বিপন্ন হয়ে পড়ছে বনাঞ্চল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব কাঠভিত্তিক চুন কারখানা অঘোষিত ‘দূষণ হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। সনাতন পদ্ধতির এসব চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ছাই পরিবেশে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
চারপাশে যত্রতত্র ‘পাজু’
অটোরিকশাচালক কামাল উদ্দিন বলেন, ছাতক থেকে গোবিন্দগঞ্জ যাওয়ার পথে আগে কোনো চুন কারখানা ছিল না। কিন্তু গত এক বছরের মধ্যে হাসনাবাদ থেকে ছাতক শহরের নতুন সেতুর আগে অন্তত এক ডজন পাজু গড়ে তোলা হয়েছে। চুন পোড়ানো শুরু হলে পুরো এলাকা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। এই ব্যবসায় প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
উপজেলার কালারুকা ইউনিয়নের আকুপুর গ্রামের কবির মিয়া জানান, গ্রামে নতুন করে অনেক পাজু তৈরি হচ্ছে। যারা চুনাপাথর আমদানি করেন, তারাই মূলত এসব পাজু বানিয়ে চুন বিক্রি করছেন।

এক পাজুতেই শত মণ কাঠ
সুরমা নদীর তীরবর্তী এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, শ্রমিকরা মাটি কেটে চুল্লি তৈরিতে ব্যস্ত। চুল্লির দক্ষিণ পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন গাছের কাঠ ও ডালপালা। আর পশ্চিম পাশে রাখা চুনাপাথর।
কারখানার কারিগর মো. কালাম জানান, একটি পাজু তৈরিতে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিকের ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। এরপর ভেতরে ৭৫ টন চুনাপাথর সাজিয়ে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। এই পাথর পোড়াতে প্রয়োজন হয় প্রায় এক হাজার ৫০০ মণ (প্রায় ৬০ টন) কাঠ। এভাবে প্রতি মাসে একেকটি পা জুতে দুইবার চুন পোড়ানো হয়।
উপজেলার প্রায় ২০০টি পাজুতে মাসে প্রায় এক হাজার ৪০০ টন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এতে আগে যে কাঠের দাম ছিল ১২০ টাকা মণ, তা এখন বেড়ে ৩০০ টাকায় ঠেকেছে। চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা থেকে ২০ থেকে ৩০টি ট্রাক ও পিকআপে কাঁচা কাঠ ছাতকে আনা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন মো. জসিম উদ্দিন বলেন, লোকালয়ে গড়ে ওঠা এসব কারখানা থেকে নির্গত গ্যাস ও ছাই মানবদেহে শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা ও ত্বকের জটিল ব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে।
ছাতক বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস জানান, তাদের জনবল সংকট চরমে। মাত্র দুজন লোক নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

চুন কারখানা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সালেক মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম বলেন, পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে ঠিকই, তবে এটি ছাতকের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা। বহু মানুষের রুটি-রুজি এর ওপর নির্ভরশীল। কারখানাগুলোকে পরিবেশের ছাড়পত্র দিয়ে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সহায়ক হলে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয়েই লাভবান হবেন।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহি উদ্দিন জানান, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পাজুর মালিকদের নিয়ে শিগগিরই বৈঠকে বসবেন তারা। অনুমোদন ছাড়া কীভাবে এগুলো চলছে, তা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো ছাড়পত্র নেই। এদের জ্বালানি কাঠ সরবরাহ বন্ধে বন বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর