নিরলস গান করে যাচ্ছি, আমৃত্যু গানই করে যেতে চাই: বাপ্পা মজুমদার

বাপ্পা মজুমদার। নন্দিত কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক। তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছে নতুন একক গান ‘গলে যাওয়া সময়’। সদ্য প্রকাশিত ও গান ও অন্যান্য প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

‘বুড়ো নাবিকের গল্প’র পর এলো আপনার লেখা আরেকটি গান ‘গলে যাওয়া সময়’। নিজ ভাবনার জগতকে চিনিয়ে দিতেই কি শিল্পী ও সংগীত পরিচালকের পাশাপাশি গীতিকার হিসেবে কাজ করা? 
শিল্পী হিসেবে প্রতিটি কাজেই নিজস্ব একটা ছাপ রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি। সংগীত পরিচালক হিসেবে যখন কোনো গান তৈরি করি, তখনও বিষয় বৈচিত্র্য নিয়ে ভাবতে হয়। পুরো প্রক্রিয়াটা তো নিজ ভাবনাকে কেন্দ্র করে এগোতে থাকে। বাকি থাকে কেবল গানের কথা লেখার বিষয়টি। নিজের লেখা বা অন্য কোনো গীতিকারের লেখা নিয়ে গান তৈরি করতে গেলেও একান্ত নিজের পরিকল্পনা প্রাধান্য পায়। হ্যাঁ, এটি বলা যায়, গীতিকার একেকটি বিষয় তুলে আনা বা দৃশ্যপট তৈরিতে গীতিকারদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসে। সে হিসাবে এটি বললে ভুল হবে না, যে ‘বুড়ো নাবিকের গল্প’ কিংবা ‘গলে যাওয়া সময়’ গান দুটিতে আমার যা ভাষ্য, তা আমার মতো করে উঠে এসেছে। গীতিকথা কিন্তু আমি আগেও লিখেছি। হয়তো এভাবে এক এক করে প্রকাশ পায়নি।

‘গলে যাওয়া সময়’কে কি অতীত রোমন্থনের গান বলা যায়?   
বলা যেতে পারে, কারণ এই গানে আমি ফেলে আসা সময়ের শূন্যতা পরিমাপের কথা বলেছি। বালু, নদী স্রোতের মতো সময় বয়ে যায়, ঘড়ির কাঁটার মতো সরে গিয়ে অনন্তে হারায়। এভাবে সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে আর দৃশ্যের মতো জমা হচ্ছে স্মৃতিকোষে। এই চিরন্তন সত্যিটাই গানে তুলে আনা হয়েছে। ভালো লাগার বিষয় হলো, এই গানের ভিডিওটি নির্মাণ করে দিয়েছেন আলোচিত চলচ্চিত্র নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল।

একক গানের আগে প্রকাশ পেয়েছে নতুন সংগীতায়োজনে গাওয়া এলআরবির কালজয়ী গান ‘রূপালি গিটার’। এ আয়োজন নিয়ে জানতে চাই। 
এই বিষয়টা তো মোটামুটি সবার জানা যে, ‘রক আইকন’ আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন উপলক্ষে একটি ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়েছে। মূলত ‘উত্তরাধিকার’ নামে সেই অ্যালবামের জন্যই দলছুটের সদস্যদের নিয়ে ‘রূপালি গিটার’ গানটি নতুন সংগীতায়োজেন গাওয়া। এ আয়োজন কেবলই একজন কিংবদন্তি শিল্পী ও সংগীত পরিচালক শ্রদ্ধা জানানোর। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, সংগীতসহ সৃষ্টিশীল প্রতিটি মাধ্যমে গুণীজন যারা আছেন, জীবদ্দশাতেই তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো উচিত। যদিও বাচ্চু ভাই [আইয়ুব বাচ্চু] আর আমাদের মাঝে নেই, তবু আজ যে শ্রদ্ধা ও সম্মান তাঁকে জানানো হচ্ছে, সেটি তাঁর জীবদ্দশাতেই দেওয়া উচিত ছিল।

কদিন আগে এ প্রজন্মের কয়েকজন শিল্পী গানে গানে আপনাকে শ্রদ্ধা জানাল, শ্রোতা আসনে বসিয়ে শোনাল আপনার জনপ্রিয় কিছু গান। ‘সেলিব্রিটিং বাপ্পা মজুমদার’ নামে সেই অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতাটা জানতে চাই? 
প্রিয় অনুজ শিল্পীদের কণ্ঠে নিজের গান শুনতে পাওয়া– ভীষণ ভালো লাগার। যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে ‘সেলিব্রিটিং বাপ্পা মজুমদার’ সংগীত সন্ধ্যার আয়োজন, তা আমৃত্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এলিটা, শুভ, জয়িতা, জয়, সন্ধি, ইউসুফ, সভ্যতা ও সৌরভ ভালোবেসে আমার গানগুলো যেভাবে গেয়েছে, তাঁর অনুরণন এখনও রয়ে গেছে। এটি শিল্পীজীবনের অন্যরকম এক পাওয়া; যার অনুভূতি কথা বলে বোঝানো যাবে না। সত্যিই আমি সৌভাগ্যবান, এমন কিছুর সাক্ষী হতে পেরে।

গানের ভুবনে পথচলার তিন যুগ পূর্ণ হতে চলেছে। পেছন ফিরে তাকালে, এই দীর্ঘ সফরটা মনের পর্দায় ধরা দেয়? 
পেছনের পুরো সময়টা চলচ্চিত্রের মতোই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনা আর অধ্যবসায়ের দৃশ্যগুলো বাদ দিলে বাকি সব প্রায় একই রকম। গান গাওয়া, সুর বাধার চেষ্টা; নয়তো বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে চালিয়ে সংগীত নিরীক্ষা চালিয়া যাওয়া– এমনই সব দৃশ্যের ঘোরাফেরা। গানের মানুষ বলেই হয়তো অতীত দৃশ্যের খুব একটা বদল হয় না। তবু অবাক লাগে, সুরের অতলে ডুব দিয়ে এতটা পথ কীভাবে পাড়ি দিয়েছি ভেবে। সময় হয়তো এমনি করেই জলের মতো আঙুলের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। তা যাক, এখন কথা হলো– সংগীতের এই দীর্ঘ সফরে আমি বেশি কিছু করতে পেরেছি কী? হয়তো পারিনি। আর পারিনি বলেই এখনও সৃষ্টির নেশা এতটুকু কমেনি। আসলে শিল্পীমনের তৃষ্ণা ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। তাই তো নিরলস গান করে যাচ্ছি, আমৃত্যু গানই করে যেতে চাই।

রুনা লায়লার সঙ্গে দ্বৈত গান গাইলেন। এরপর কী আপনাদের গানের কোনো অ্যালবামের আশা করা যায়? 
এ নিয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। আমি এই প্রাপ্তিতে খুশি যে, রুনা লায়লার মতো জীবন্ত কিংবদন্তির সঙ্গে দ্বৈত গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। শিল্পীজীবনে এটি ছিল অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। একই সঙ্গে সংগীত ক্যারিয়ারের এক পরম প্রাপ্তি। রুনা লায়লার কণ্ঠ ও গায়কি নিয়ে কিছু বলার সাহস নেই। তাঁর জন্য গানের সুর করতে পারাই ছিল আমার অন্যরকম আনন্দের। ‘অনায়াসে’ গানটি মূলত রুনা লায়লার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু গানের সুর শুনে তিনি নিজ থেকেই বলেছিলেন, ‘তুমি বরং আমার সাথে গাও, গানটি ডুয়েট হোক!’ এই প্রস্তাব সংগীত জীবনের অনন্য উপহার হিসেবেই গ্রহণ করেছি।

এ মুহূর্তে নতুন কী করছেন?
ব্যান্ড দলছুট আর নিজের একক গানের কাজ করছি। এর বাইরেও কিছু কাজ আগে থেকেই ঠিক করা থাকে, যেমন সিনেমার নিজের বা অন্য কোনো শিল্পীর প্লেব্যাকের কম্পোজিশন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল এসব। এমন কিছু কাজও হাতে আছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর