সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসছে কাল ১৩ স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ হারাচ্ছে বিরোধী দল পদ পেতে সরকারের শর্ত মানতে রাজি নয় বিরোধী দল

সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি বর্জনের কারণে সংসদের ১৩ স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ হারাচ্ছে বিরোধী দল। এ জন্য বিরোধী দলের অনাগ্রহকে দায়ী করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি জানিয়েছেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া সংসদের তৃতীয় অধিবেশনেই কমিটি গঠনের কাজ শেষ হবে। আগের সংসদের রেওয়াজ মেনে এবারের কমিটিও গঠন করা হবে।

যদিও জুলাই সনদ অনুযায়ী, ১৪টি স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের দায়িত্ব পাওয়ার কথা। ত্রয়োদশ সংসদের শুরু থেকেই গণভোটের রায় নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব করলেও এর জের ধরে তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় তারা।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম গত রাতে সমকালকে জানান, জুলাই সনদ অনুযায়ী বিরোধী দলের সদস্যদের সভাপতির পদ পেতে সরকারের পক্ষ থেকে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক এই প্রস্তাবে সরকারের তরফে বিরোধী দলকে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নিলেই এই পদ পাওয়া যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের জন্য সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যে ৫০টি সংসদীয় কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুই অধিবেশন শেষে মাত্র ১৫টি কমিটি গঠন হয়েছে। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়বিষয়ক ৯টি এবং বিষয়ভিত্তিক কমিটি ছয়টি। বাকি ৩৫টি কমিটি এ অধিবেশনেই গঠন করতে হবে। ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি আছে ৩৯টি। বিষয়ভিত্তিক কমিটি রয়েছে ১১টি।

২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ২৪ নম্বর সুপারিশে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদের বিষয়ে বলা আছে, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদের আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে। অর্থাৎ, বিষয়ভিত্তিক চার কমিটি ছাড়াও সংখ্যানুপাতে বিরোধীদের ৯০ সদস্যের বিপরীতে আরও ১০টি সভাপতির পদ বিরোধী দল পাওয়ার কথা। গত দুই অধিবেশনে গঠিত ১৫ স্থায়ী কমিটির মধ্যে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির একটি পদ দেওয়া হয়েছে বিরোধী দলকে।

এই সনদের বেশ কয়েকটি বিষয় ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও কমিটি গঠনের এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ৩০টি দল ঐকমত্য পোষণ করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, শর্তারোপের অভিযোগ সঠিক নয়, সংসদীয় কার্যক্রম চলে রেওয়াজ অনুযায়ী। অতীতে সংসদীয় কমিটি গঠনে যে প্রক্রিয়া মেনে হয়েছে, এবারও তাই অনুসরণ করা হবে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ পাস হওয়ার পরে সেটা মেনে কমিটি গঠনের বিষয়টি সামনে আসবে। এখন পর্যন্ত সংবিধান সংশোধনই হয়নি।

স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দিতে সংবিধান সংশোধন বাধ্যতামূলক কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, একজনে হ্যান্ডশেক হয় না। সনদ বাস্তবায়নে বিরোধী দল আন্তরিকতা দেখিয়ে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নিলে সরকারি দলও হাত বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, সংসদের অধিবেশনে কমিটি গঠন বা পরিবর্তন যে কোনো সময়েই সম্ভব। তবে এ বিষয়ে তারা প্রথম থেকেই নেতিবাচক আচরণ করছে।

সংক্ষিপ্ত হবে এবারের অধিবেশন
আগামীকাল বিকেল ৩টা থেকে শুরু হতে যাওয়া এই অধিবেশন সংক্ষিপ্ত হবে বলে আভাস দিয়েছেন সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখার কর্মকর্তারা। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য বসা এই অধিবেশন শুরুর আগে দুপুর ২টায় কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে অধিবেশনের মেয়াদ ও কার্যাবলি চূড়ান্ত করা হবে।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হতে পারে এই অধিবেশনের মেয়াদ। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে ১১ আগস্ট সংসদ অধিবেশন আহ্বান করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী, দুটি অধিবেশনের মধ্যবর্তী বিরতি ৬০ দিনের বেশি হবে না। গত ১৫ জুলাই সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হয়। এ হিসাবে আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অধিবেশন শুরুর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সম্মেলন থাকায় কিছুটা আগে অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এ অধিবেশনের পর ২১ সেপ্টেম্বর সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাবেন।

জাতীয় ইস্যুতে সরব থাকতে প্রস্তুত বিরোধী দল 
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, চলমান বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে তারা সংসদে সরব থাকার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। কার্যপ্রণালি বিধি মেনে এসব ইস্যুতে সংসদে নোটিশ দেওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে। কে, কোন ইস্যুতে নোটিশ দেবেন, তা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।

এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল এই অধিবেশনে উঠবে। বিলগুলো নিয়ে বিরোধী দল ইতোমধ্যেই তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন। সংসদের বৈঠকেও তা যথাযথভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

যদিও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকেও এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি জানান, এ অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও এবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হবে। বিরোধী দল হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আসতে পারে। এ ধরনের কোনো ইস্যু এলে নিশ্চয়ই এর ওপর আলোচনা হবে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন ইতোমধ্যে সংসদ সচিবালয়ে জমা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া ব্যাংক রেজ্যুলেশন (সংশোধন) আইন এবং র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইনও বিল আকারে তোলার জন্য শিগগিরই জমা হবে। এসব বিল তোলার পর চলতি অধিবেশনেই পাস হতে পারে।

এদিকে, অধিবেশন শুরুর আগে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বিএনপিদলীয় সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর