বরিশালে ১০০ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতাল নগরের মধ্যভাগে অবস্থিত। বিদ্যুৎ বিভাগ ওই এলাকার ফিডারের নাম রেখেছে ‘সদর হাসপাতাল ফিডার’। প্রতিদিন শতাধিক রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন আরও কয়েকশ রোগী। গত শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার রাত ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ছয়বার লোডশেডিং হয়। মোট এই সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। অথচ কর্মকর্তারা বলছেন, মানবিক কারণে তারা সদর হাসপাতাল ফিডারে সবচেয়ে কম লোডশেডিং দেন।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) বরিশাল বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের আওতাধীন পলাশপুর গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে ‘সদর হাসপাতাল ফিডার’ নিয়ন্ত্রিত হয়। সাব-স্টেশনের লোডশেডিংয়ের তথ্য লেখার খাতা ঘেঁটে দেখা গেছে, শনিবার রাত ১২টা থেকে সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত– এই ৩৯ ঘণ্টায় মোট ৯ বার সদর হাসপাতাল ফিডারে লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। ৯ বারে মোট সাত ঘণ্টা ৪০ মিনিট হাসপাতালটি বিদ্যুৎহীন ছিল। তার মধ্যে এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়েছে ছয়বার এবং অপর তিনবার ছিল ৪৫ মিনিট, ৩৮ মিনিট ও ১৭ মিনিট করে। এই ৩৯ ঘণ্টার হিসাবের মধ্যে শনিবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৪০ মিনিট এবং রোববার রাত ২টা ৪৯ মিনিট থেকে ৩টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত হাসপাতালে বিদ্যুৎ ছিল না।
সদর হাসপাতালের ফিডারে ৩৯ ঘণ্টায় ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লোডশেডিং দেওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে পলাশপুর সাব-স্টেশন বোর্ড অ্যাটেনডেন্ট (এসবিএ) আবু জাফর মো. সালেহ সমকালকে বলেন, ‘শুধু হাসপাতালটির জন্য মানবিক কারণে আমরা সদর হাসপাতাল ফিডারে সবচেয়ে কম লোডশেডিং দিই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাদের এ নির্দেশনা দিয়েছেন।’
সোমবার দুপুর আড়াইটায় সদর হাসপাতালে ঢুকে দেখা যায়, তখন সেখানে লোডশেডিং চলছে। ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে রোগীরা হাঁসফাঁস করছেন। স্বজনরা হাতপাখায় বাতাস করছেন। ডায়রিয়া ওয়ার্ড নামে পরিচিত টিনশেড ভবনে ঢুকে দেখা যায়, কয়েকটি শয্যায় সাদা মশারির ভেতর ডেঙ্গু রোগী রাখা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ হাসপাতালের একমাত্র জেনারেটর বহু বছর ধরে বিকল হয়ে আছে। এ কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ হলে বিকল্প ব্যবস্থা হলো মোমবাতি ও হাতপাখা।
এ প্রসঙ্গে সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মলয় কৃষ্ণ বড়াল সমকালকে বলেন, বিকল জেনারেটরটি করোনা মহামারির সময়ে সচলের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে
প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, এটি আর সচল করা হবে না। লোডশেডিংয়ের সময় আইপিএস দিয়ে অস্ত্রোপচার কক্ষ সচল রাখা হয়।
ওজোপাডিকোর বরিশাল বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনায় নগরী ও আশপাশ এলাকাকে মোট ৩৮টি ফিডারে ভাগ করা হয়েছে। ফিডারগুলো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সাতটি সাব-স্টেশন। পলাশপুর সাব-স্টেশনের আওতাধীন সাতটি ফিডার হচ্ছে– সদর রোড, চকবাজার, সদর হাসপাতাল, আমানতগঞ্জ, পোর্টরোড, তালতলী ও এমইপি।
নগরের প্রাণকেন্দ্র সদর রোড ও গির্জামহল্লা এলাকা নিয়ে হলো সদর রোড ফিডার। চকবাজার নগরের বড় বিপণিকেন্দ্র। সদর হাসপাতাল ফিডারে সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার রয়েছে। পোর্ট রোডে পাইকারি মৎস্য মোকাম। হাটখোলায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বিদ্যুৎসামগ্রী উৎপাদনকারী কারখানার এমইপির জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট একটি ফিডার।
এসবিএ মো. মাসুম জানান, পলাশপুর স্টেশনে বিদ্যুতের চাহিদা পিক সময়ে ১৭ মেগাওয়াট এবং অফপিকে ১৫ মেগাওয়াট। কিন্তু কখনও ৯ থেকে সাড়ে ৯ মেগাওয়াটের বেশি সরবরাহ পান না। এ জন্য স্টেশনের সাতটি ফিডারের মধ্যে সার্বক্ষণিক কমপক্ষে তিনটিতে লোডশেডিং চলে। মাঝেমধ্যে চারটিতেও দিতে হয়।
সদর রোড ফিডারের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, শনিবার রাত ১২টা থেকে সোমবার রাত সোয়া ৮টা পর্যন্ত ৪৪ ঘণ্টায় ১১ বার লোডশেডিং হয়েছে। রোববার রাত ১২টা থেকে হিসাব অনুযায়ী রাত ১২টা থেকে ২টা ১০ মিনিট, সোমবার বেলা সোয়া ১১টা থেকে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিট, দুপুর ১টা ৩৫ থেকে ২টা ৩৫ মিনিট, ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা, বিকেল ৫টা ৪৫ থেকে ৬টা ৪৫ এবং সন্ধ্যা ৭টা ২০ থেকে রাত ৮টা ২০ পর্যন্ত লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। অথচ এই ফিডার এলাকায় সবচেয়ে বেশি ব্যাংক ও অন্যান্য বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
জনরোষের আতঙ্কে সাব-স্টেশনে দায়িত্বরতরা
পলাশপুর সাব-স্টেশনে দায়িত্ব পালন করেন তিনজন এসবিএ আবু সালেহ মো. জাফর, মো. মাসুম ও মোশারফ হোসেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লোডশেডিং নিয়ে তারা জনরোষের শিকার হওয়ার আতঙ্কে থাকেন। প্রায় ১৫ দিন আগে রাত আড়াইটার দিকে লোডশেডিং দেওয়া হলে পলাশপুর এলাকার কয়েকশ বাসিন্দা গিয়ে স্টেশনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। সদর রোডে নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ভিআইপিদের নানা কর্মসূচি থাকায় এ ফিডারে লোডশেডিং দিতে তাদের নানা হিসাব-নিকাশ করতে হয়।
আবার মানবিক অনেক আবেদনও রাখতে হয় জানিয়ে মো. মাসুম জানান, কয়েক দিন আগে গভীর রাতে হাসপাতাল ফিডারে লোডশেডিং দেওয়ার পরই একজন স্বজন ফোন দিয়ে জানান, রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎটা খুব প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক ওই ফিডারে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়।
লোডশেডিং করার পর প্রভাবশালীর ফোন ও রূঢ় ব্যবহারের মুখে বিদ্যুৎ দিতে হয়েছে– এমন ঘটনা অসংখ্যবার ঘটেছে বলে জানান তিনজন এসবিএ। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রাহকের অনুরোধ রাখতে গিয়ে পুরো সাব-স্টেশনকে আবার শাস্তি পেতে হয়। শাস্তি হিসেবে প্রধান গ্রিড থেকে সাব-স্টেশনে কমপক্ষে আধাঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন স্টেশনের আওতাধীন সব ফিডার বিদ্যুৎহীন থাকে। প্রতি সপ্তাহে একাধিকবার এমন শাস্তি ভোগ করতে হয়।
ওজোপাডিকোর বরিশাল গ্রিড স্টেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান পলাশ সমকালকে জানান, বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা হলো পিক সময়ে ২২০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পান ১৬০ মেগাওয়াট। এ ঘাটতির কারণে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ হারে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।


