সাতমাথা থেকে গোহাইল রোডে ঢুকলে বদলে যায় বগুড়া শহরের চেহারা। তিন কিলোমিটার সড়কজুড়ে গর্তের পর গর্ত। কোথাও পিচ উঠে খোয়া বেরিয়ে এসেছে, কোথাও খোয়ার স্তরও নেই। পানিতে ডুবে থাকা এসব গর্তের গভীরতা বোঝার উপায় নেই।
গত সোমবার সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত স্কুটি নিয়ে ঘোরেন এ প্রতিবেদক। এই আড়াই ঘণ্টায় পাঁচ হাজার গর্ত গোনার পর আর হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি। এসব গর্তের কোনোটি এত গভীর যে, মোটরসাইকেল ও স্কুটির বডি ঠেকে যায়। এর মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক, অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, ট্রাক ও বাস।
বগুড়ার গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের দুর্ভোগ ঘোচাতে চার মাস আগে শুরু হয়েছে ২৬ কোটি ৬০ লাখ ১১ হাজার ৩০০ টাকার কাজ। প্রকল্পে পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি তিন কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন, ফুটপাত ও স্ট্রিট লাইট নির্মাণের কথা। গত ২৭ মে খান্দারে উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করা হয়। চার মাস পেরিয়ে গেলেও মূল কাজের অগ্রগতি নেই। পশ্চিম পাশে ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরুর পরই থেমে আছে। ফলে যে প্রকল্পে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ঘোচার কথা, সেটি এখন ভাঙা সড়ক, পাঁচ হাজারের বেশি গর্ত, জমে থাকা পানি, খোঁড়াখুঁড়ি ও অসমাপ্ত ড্রেনের কারণে নগরবাসীর নতুন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গর্তে গর্তে তিন কিলোমিটার
সাতমাথা থেকে গোহাইল রোডের কৈগাড়ী থেকে ফুলতলা অংশে কার্পেটিং উঠে গেছে। এখানে কোথাও কোথাও ইটের সোলিং করা হয়েছিল। সেই ইট দেবে তৈরি হয়েছে নতুন গর্ত। কোথাও সড়কের মাঝখানেই পিচ উঠে খোয়ার স্তর বেরিয়ে আছে। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র সিঅ্যান্ডবি গোডাউন থেকে মাহাবুব নগরের সামনের অংশে। এই অংশের কার্পেটিং এমনভাবে উঠে গেছে, এখানে এক সময় পাকা সড়ক ছিল কিনা, তা বোঝাই কঠিন। একটি মোটরসাইকেল গর্তে পড়ার পর চালককে ভারসাম্য হারাতে দেখা যায়। এলাকাবাসী বলছেন, এ অংশে প্রায় রিকশা উল্টে যায়। মোটরসাইকেল ও স্কুটি চালকদেরও গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে।
সাতমাথা থেকে গোহাইল রোডে রিকশা, ভ্যান কিংবা অটোরিকশা নিয়ে যেতে চান না অনেক চালক। গত সোমবার সকালে ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক মনির হোসেন বলেন, গর্তে চাকা পড়লে রিকশা উল্টে যাওয়ার ভয় থাকে। রিকশারও ক্ষতি হয়। অনেক সময় মোটর পুড়ে যায়। তাই অনেক চালক এই রাস্তা এড়িয়ে চলেন।
প্রতিদিন অফিস যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন আমির হামজা। তাঁর ভাষ্য, কোন গর্ত কতটা গভীর বোঝা যায় না। কিছু গর্তে চাকা পড়লে মোটরসাইকেলের নিচের অংশ মাটিতে ঠেকে যায়। পানি জমলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
শুরুর পর থমকে আছে ড্রেনের কাজ
এই সড়কের পশ্চিম পাশে ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু করেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মাত্র কয়েক মিটারের মতো বক্সড্রেনের কাজ দেখা গেছে। এর পরই কাজ থমকে আছে। এখন সড়কের কোথাও ড্রেনের জন্য মাটি খুঁড়ে রাখা, কোথাও অর্ধনির্মিত কাঠামো পড়ে আছে। ড্রেনের পাশ বালু দিয়ে ভরাট করার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে মাটি ও খোয়ার রাবিশ ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
প্রকল্প নথি অনুযায়ী, নেকটার থেকে সাতমাথা পর্যন্ত ৩ দশমিক ০৯২ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নর্মাণের সঙ্গে তিন কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন ও ৩ দশমিক ০৯২ কিলোমিটার স্ট্রিট লাইট নির্মাণের কথা রয়েছে। এর সঙ্গে ফুটপাতসহ আনুষঙ্গিক কাজও সংযুক্ত আছে। কিন্তু ফুলতলা থেকে বন বিভাগের কার্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে ড্রেনের কাজে হাত দেওয়া হয়নি।
নথিতে বেহাল, মাঠে আরও ভয়াবহ
গোহাইল রোডের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা প্রকল্পের মূল্যায়নেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নথিতে বলা হয়েছে, সড়কের বিভিন্ন অংশে গর্ত ও উঁচুনিচু পৃষ্ঠ রয়েছে। বিদ্যমান ড্রেন সরু, ক্ষতিগ্রস্ত ও পলিতে ভরা। কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। ফলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে সড়ক ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। তবে নথিতে যে কথা বলা হয়েছিল, সরেজমিন আরও ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। পাঁচ হাজার গর্তের হিসাব থামিয়ে দিতে হয়েছে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের একাধিক প্রকৌশলী বলেন, গত পাঁচ বছরে এই সড়কে বড় কোনো কাজ হয়নি। মেরামতের বাজেট থেকে ছোটখাটো সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা হয়েছে। এসব কাজ দু-তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি।
গোহাইল রোডের এই অংশটি সহনশীল নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প (আরইউটিডিপি) প্যাকেজের আওতাধীন। সরকারি নথি অনুযায়ী, নেকটার থেকে সাতমাথা পর্যন্ত ৩ দশমিক ০৯২ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত বিসি সড়ক পুনর্নির্মাণ, তিন কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন, ফুটপাত, স্ট্রিট লাইটসহ আনুষঙ্গিক উন্নয়ন হবে। চুক্তিপত্র অনুযায়ী প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ২৬ কোটি ৬০ লাখ ১১ হাজার ৩০০ টাকা। কাজ শুরুর তারিখ ২৭ মে ২০২৬। ২০২৭ সালের ২৬ নভেম্বর যা শেষ হওয়ার কথা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কাজটি বাস্তবায়ন করছে বগুড়া সিটি করপোরেশন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান শামিম এন্টারপ্রাইজ (প্রা.) লিমিটেড, এসইপিএল-আরএসই (জেভি)। নথিতে থাকা ময়মনসিংহের ইসমাইল রোড, কাচারিঘাটের ঠিকানায় একটি ও ঢাকার একটি ল্যান্ডফোন নম্বরে যোগাযোগ করেও শামিম এন্টারপ্রাইজের কারও সঙ্গে কথা বলা যায়নি। সিটি করপোরেশনের প্রধান সহকারী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তারাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজটি করছে বগুড়ার আর এস কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম বলেন, নেকটার থেকে সাতমাথা পর্যন্ত তিন কিলোমিটার সড়ক এবং সাতমাথা থেকে করতোয়া নদী পর্যন্ত আরেকটি প্রকল্পের ড্রেনের কাজ তারা করছেন। ইতোমধ্যে তাদের বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে। বিল না পাওয়ায় কাজের গতি কমানো হয়েছে। তিনি বলেন, তিন কোটি ১৭ লাখ টাকার একটি আংশিক বিল সিটি করপোরেশনে জমা দেওয়া হয়েছে। বিলটি পেলে কাজ পুরোদমে শুরু করা হবে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী মুহম্মদ সাইদ আলী বলেন, কাজটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হচ্ছে। কাজের শর্তেই বিল প্রাপ্তিসাপেক্ষে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এখন এই অজুহাতে কাজ বন্ধ বা ধীরগতির সুযোগ নেই। ঠিকাদারকে সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কাজ শুরু না করলে প্রয়োজনে পুনরায় ঠিকাদার নির্বাচন করা হবে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, মূল ঠিকাদার কাজে আসছেন না। তিনিও ঠিকাদারকে চেনেন না। তাঁর বদলে বগুড়ার প্রতিনিধি কাজ করছেন। তারা সময়মতো কাজ করতে পারছেন না। তাগাদা দিয়েও লাভ হচ্ছে না। এখন এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন।


