প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ও সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহারকে পুঁজি করে ছড়িয়ে পড়া ডিজিটাল প্রতারণা, ভুয়া প্রচারণা ও গুজবের ফাঁদ থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পুঁজিবাজারের অংশীজন ও নীতিনির্ধারকরা। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার অবাস্তব লোভ ও চটকদার প্রলোভনে না পড়ে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, প্রকৃত নগদ প্রবাহসহ মৌলভিত্তি যাচাই করে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
গতকাল সোমবার রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই ভবনে ‘ডিজিটাল প্রতারণা ও সতর্কতা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এমন পরামর্শ দিয়েছেন। এই সেমিনারের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের সমাপনী আয়োজন। সমাপনী অনুষ্ঠান যৌথভাবে আয়োজন করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, বিনিয়োগকারী সচেতনতা পুলিশের বিশেষ সপ্তাহের মতো কেবল এক সপ্তাহের বিষয় নয়; বছরব্যাপী বজায় রাখতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ার পেছনে মানুষের রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভ কাজ করে।
কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বিএসইসি চেয়ারম্যান সতর্ক করে বলেন, মুনাফা একটি ধারণা মাত্র, কিন্তু নগদ টাকাই হলো প্রকৃত সত্য। তাই নিছক হিসাবের খাতার মুনাফা না দেখে কোম্পানির পরিচালন নগদপ্রবাহ ইতিবাচক কিনা, তা দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ঘোড়াকে টেনে পানির কাছে নেওয়া গেলেও জোর করে পানি খাওয়ানো যায় না– এমন প্রচলিত প্রবাদের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যত উদ্যোগই নিক না কেন, বিনিয়োগকারীদের নিজেদেরও জানার ও শেখার মানসিকতা তৈরি করা ছাড়া প্রতারণা কমিয়ে আনা সম্ভব নয়।
মাসুদ খান জানান, আগামী ৩০ নভেম্বর পুঁজিবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। তহবিলের মেয়াদ এবং আকার বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক সমাধানের প্রত্যাশা রয়েছে।
আইপিও সংস্কার বিষয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, আইপিও বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং তা জনমতের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। অডিট প্রক্রিয়ায় বিশেষ স্ক্রিনিং বা নিরীক্ষকদের মাধ্যমে বাড়তি যাচাইয়ের ব্যবস্থা রেখে আইপিও অনুমোদনের সময়সীমা দুই মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও ভারী শিল্পের ক্ষেত্রে পুঞ্জীভূত লোকসানের বিদ্যমান শর্ত শিথিল করা এবং আইপিওর অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধের সীমা ৩০ শতাংশ থেকে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারের মূল চালিকাশক্তি হলো সময়মতো, সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যের অবাধ প্রবাহ। তবে বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহারের ফলে ডিজিটাল প্রতারণা একটি বিরাট সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ বা পেজে স্টক এক্সচেঞ্জ, বিএসইসি কিংবা ব্রোকারেজ হাউসের নকল লোগো ব্যবহার করে নিজেদের ভুয়া বিশেষজ্ঞ দাবি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। দুই সপ্তাহে টাকা দ্বিগুণ করার চটকদার ফাঁদ পেতে মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই প্রতারণা রুখতে ডিএসই সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড মনিটরিং প্রযুক্তি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
বিএসইসির কমিশনার নাফিজ আল তারিক বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দ্রুত মুনাফার লোভেই স্ক্যামারদের ফাঁদ সফল হয়। মার্কিন ইতিহাসের আলোচিত প্রতারক বার্নার্ড ম্যাডফের পঞ্জি স্কিমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চরম অস্থিতিশীল বাজারেও যদি কোনো ফান্ড অস্বাভাবিকভাবে ধারাবাহিক স্থিতিশীল মুনাফা দেখাতে থাকে, তবে সেটিই সবচেয়ে বড় বিপদের লক্ষণ। তিনি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের দুটি মূল নীতি স্মরণ করিয়ে দেন– প্রথম নিয়ম কখনও পুঁজি হারানো যাবে না, দ্বিতীয় নিয়ম হলো কখনও প্রথম নিয়মটি ভুলে যাওয়া যাবে না।
বিএসইসির কমিশনার নাহিদ মাহতাব বলেন, ডিজিটাল প্রতারণা কেবল সাইবার অপরাধের বিষয় নয়; এটি সরাসরি বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, বাজারের স্বচ্ছতা ও সামগ্রিক আস্থার ওপর আঘাত। কমিশনার হোসেন সাদাত বাজারসংশ্লিষ্ট পেশাদারদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বাজারে সেবা দিতে হলে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে– প্রথমত জানতে হবে, দ্বিতীয়ত বুঝতে হবে এবং তৃতীয়ত নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আরেক কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান পুঁজিবাজারে আর্থিক সুশাসন, হিসাবের স্বচ্ছতা ও সঠিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেন।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, বাজারের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্রোকারদের যেমন নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি বিনিয়োগকারীদেরও ন্যূনতম আর্থিক সাক্ষরতা অর্জন করে নিজস্ব বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে বিনিয়োগ করতে হবে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসইর আইসিটি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আবু নূর মোহাম্মদ হাসানুল করিম।


