আসামি বিএনপির তিন নেতা, মামলা নিতে গড়িমসি

নওগাঁর ধামইরহাটে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে গভীর রাতে বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, মারধর ও ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। ঘটনার ১২ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ মামলা নেয়নি বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

দক্ষিণ ফার্সিপাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তাণ্ডবের ভয়াবহ চিত্র। গত ১ অক্টোবর রাত দেড়টার দিকে ৫০-৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে সোলাইমান আলীর বাড়িতে হামলা চালায়। পাঁচটি ইটের ঘর, আসবাব, বৈদ্যুতিক মিটার ও টয়লেট ভাঙচুরের পাশাপাশি ১২০টি কলাগাছসহ বেশ কিছু ফলদ গাছ কেটে ফেলা হয়। হামলাকারীরা ঘরের মালপত্র, টাকা-পয়সা, সিলিং ফ্যান ও পানির মোটর লুট করে নিয়ে যায়। বাধা দিলে সোলাইমান আলী ও তাঁর বড়মা গুলছিয়ারা বেগমকে মারধর করা হয়। এমনকি ভাড়াটিয়াদের মারধর করে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মাঝরাতে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মেহেরুল হাসান মেবু এবং রিকশা ও অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুল হামিদসহ অভিযুক্তদের নামে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করছে।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, আব্দুল কুদ্দুস ও শরীফ উদ্দিন আমাইতাড়া মৌজায় হাজেরা বিবি ও ময়েন উদ্দিন মণ্ডলের কাছ থেকে দুই দাগে মোট ১ দশমিক ০২ একর জমি কেনেন। একই জমি তোজাম্মেল হকও কিনেছেন বলে দাবি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ভূমি অফিসে শুনানি হয়। জমিসংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা যায়, বিবাদীপক্ষ তোজাম্মেল হকের দাখিল করা ৩৫৮/১৯৭৪ নম্বর দলিলের স্বাক্ষর ও সিলে গুরুতর গরমিল থাকায় এবং সার্টিফায়েড কপি দেখাতে না পারায় ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিব্বির আহমেদ ওই নামজারি বাতিল করেছিলেন।

বাড়িটির দীর্ঘদিন ধরে থাকা ভাড়াটিয়া দুলাল হোসেন ও প্রতিবেশী আরিফুল ইসলাম জানান, প্রায় ছয় বছর ধরে তারা এই বাড়িতে বসবাস করছেন এবং জমিটি সবসময় সোলাইমানদের দখলেই ছিল। ভাঙচুরের পর থেকে দরজা-জানালাহীন খোলা ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

ভুক্তভোগী সোলাইমান আলী বলেন, ‘ভূমি অফিসের কাগজপত্রে আমরা বৈধ মালিক এবং বহু বছর ধরে ভোগদখলে আছি। অথচ সন্ত্রাসী কায়দায় বাড়ি ভেঙে আমাদের পথে বসানো হলো। থানায় গিয়েও বিচার পাচ্ছি না, উল্টো আসামিরা প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে। ’

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা রিকশা ও অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুল হামিদ দাবি করেন, জায়গাটির দখল মূলত তাদেরই ছিল এবং প্রতিপক্ষই তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। একই সংগঠনের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মেহেরুল হাসান মেবুর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।

ঘটনার বিষয়ে ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমান রাজনৈতিক চাপের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি আইনি জটিলতা ও আদালতের রায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। আদালতের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ও রায়ের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ওই জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে পুলিশের এককভাবে কিছু করার সুযোগ নেই।’ তবে বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও মারধরের লিখিত অভিযোগের বিষয়ে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় মামলা কেন নেওয়া হয়নি, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকৌশলী এনামুল হক বলেন, ‘ঘটনার পরদিন আমি প্রতিনিধি পাঠাই এবং পরে নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ধামইরহাটে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। আমি প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি।’

মানবাধিকারকর্মী নাইস পারভীন বলেন, ‘জমির মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি মামলা বা আদালতের রায় থাকতে পারে, কিন্তু গভীর রাতে বাড়িঘর ভাঙচুর, মারধর বা লুটপাট সম্পূর্ণ ফৌজদারি অপরাধ। আদালতের রায়ের অজুহাতে এমন সহিংস অপরাধের মামলা না নেওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বিপজ্জনক।’

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর