সুন্দরবন ঘেঁষে অবস্থিত সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খাগড়াঘাট গ্রাম। চারপাশে পানির কমতি নেই, অথচ সুপেয় পানির জন্য বছরের পর বছর ধরে ভুগেছেন রহিমা বেগম (৪৫)। তাঁর পরিবারের নারী ও শিশুদের দীর্ঘদিন ধরে পানি আনতে হাঁটতে হয়েছে মাইলের পর মাইল। বর্ষায় তারা বৃষ্টির পানি জমিয়ে রেখে ব্যবহার করতেন। বছরের বাকি সময় তাদের সম্বল ছিল নোনাপানি। এ জন্য সন্তানেরা পেটের পীড়ায় ভুগতে হয়েছে বছরভর।
রহিমা বেগমদের সেই দুর্দশার অবসান ঘটিয়েছে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপ। গতকাল শনিবার খাগড়াঘাটে একটি রিভার্স অসমোসিস (আরও) পানি শোধনাগার বসিয়েছে তারা। একই দিন আরেকটি শোধনাগার বসানো হয়েছে পাশের কৈখালী গ্রামে। এই গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আমেনা খাতুন বলেন, আগে এক কলস মিষ্টি পানির জন্য তাদের দুই-তিন মাইল হাঁটতে হতো। এখন বাড়ির কাছে কল বসায় যেন তাদের পুনর্জন্ম হয়েছে।
খাগড়াঘাটের রহিমা বেগম বলছিলেন, এখন কল টিপলেই মিষ্টি পানি বের হয়। এই প্রযুক্তি তাদের জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে। বাড়ির মেয়েদের আর বিদ্যালয় কামাই করে পানির জন্য ছুটতে হবে না।
দুটি পানি শোধনাগারের একটি বসানো হয়েছে খাগড়াঘাট গ্রামের নূরউদ্দীনের বাড়ির সামনে, অপরটি স্থাপন করা হয়েছে কৈখালীর আলাউদ্দিন মল্লিকের বাড়ির সামনে। এগুলো উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ। তিনি বলেন, উপকূলের পানির সংকট তাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এ কারণে এমন একটি স্থায়ী সমাধান চেয়েছিলেন, যা সরাসরি মানুষের জীবন বাঁচাবে, শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করবে। সে জন্যই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পানি শোধনাগার স্থাপনের এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
শ্যামনগরের চিকিৎসক আমজাদ হোসেনের ভাষ্য, পানিতে আয়রন বেশি থাকলে পানি লালচে হয়। স্বাদও হয় তেতো। এতে পেটের নানা অসুখ হয়। দাঁত নষ্ট হয়। শোধনাগারের পানিতে সেই লালচে ভাব বা তেতো স্বাদ নেই।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পানির জন্য সব গ্রাহককে ডিজিটাল কার্ড দেওয়া হয়েছে। কলের সামনে সেই কার্ড ধরলে পানি পড়ে, সরালেই বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিটি প্লান্টে ১০টি করে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। সেই সৌরবিদ্যুতে পাম্প চলে, ফলে পল্লীবিদ্যুতের ওপর চাপ পড়ে না। প্রকল্পটি পরিচালনা করছে শ্যামনগরের তরুণদের সংগঠন শরুব ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যরা। এর মাধ্যমে গ্রামের বেকারত্ব কিছুটা কমবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় দেখা গেছে, পানি শোধনাগারে শোধনের পর পানিতে লবণের পরিমাণ সরকার নির্ধারিত সীমার অনেক নিচে নেমেছে। পানিতে গলে থাকা লবণ ও খনিজ মাপা হয় টিডিএস দিয়ে। কৈখালীর সাধারণ নলকূপের পানিতে টিডিএসের পরিমাণ ৮ হাজার ২১৭ মিলিগ্রাম। শোধনের পর তা নেমেছে ২৮ মিলিগ্রামে। খাগড়াঘাটে ছিল চার হাজার ৮১ মিলিগ্রাম, শোধনের পর যা হয়েছে মাত্র ৯২ মিলিগ্রাম। কৈখালীর পানিতে আয়রন ছিল ১ মিলিগ্রাম, শোধনের পর মাত্র ০.০১ মিলিগ্রাম আয়রন পাওয়া গেছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।


