টুপটুপ রিসোর্টে আগুন নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকার জন্য ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পোড়া মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষার ফল পেতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

এদিকে স্বজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আরও একজন নিখোঁজ থাকতে পারেন। তাঁর খোঁজে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে আবারও তল্লাশি চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস।

গত শনিবার সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সদস্যদের সহায়তায় উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। এ সময় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দগ্ধ ছয়জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, সিআইডির দল মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাবে। ডিএনএ পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় তিন থেকে চার সপ্তাহ লাগতে পারে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, আগুনে মরদেহগুলো এমনভাবে পুড়ে গেছে যে কোনটি কার, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের পর স্বজনের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কমিটির প্রধান তাসনীম জাহান বলেন, স্বজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার সময় ওই ব্যক্তি রিসোর্টে ছিলেন কিনা, তা যাচাই করা হচ্ছে। ১০টি মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হলে নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, আরও কেউ নিখোঁজ আছেন কিনা, তা নিশ্চিত হতে রোববার সকাল থেকে ধ্বংসস্তূপে আবার তল্লাশি শুরু হয়েছে।

হাসপাতালে স্বজনের অপেক্ষা

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের বাইরে গতকালও অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা। তাদের কেউ মোবাইল ফোনে স্বজনের মরদেহের ভিডিও দেখাচ্ছিলেন, কেউ পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আগুনে মরদেহের চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাদের পক্ষে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা রিয়াজ মাহমুদ রিপন বলেন, তাঁর পরিবারের ৯ জন সদস্য কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মারা গেছেন এবং তিনজন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আহত ব্যক্তিরা বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি দেওয়ান ফয়সালও স্ত্রী নাসরিন আক্তারের খোঁজে কক্সবাজারে এসেছেন। তিনি বলেন, মরদেহের অবস্থা দেখে কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নাসরিন আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।

মনিরামপুরের একই পরিবারের চারজন নিহত

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে যশোরের মনিরামপুর পৌরসভার মোহনপুর এলাকার একই পরিবারের চারজন রয়েছেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। তারা হলেন নাহিদুর রহমান তুহিন (৪০), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৫) এবং তাদের দুই মেয়ে রুজায়না ইয়ানা (৭) ও সুনায়না ইয়ানা (৩)। আগুনে মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয়ও নিশ্চিত করা যায়নি।

নাহিদুর রহমানের বাবা মতিয়ার রহমান জানান, তুহিন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। শুক্রবার সকালে তারা ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টের একটি কক্ষে ওঠেন। শুক্রবার বিকেলে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। গতকাল তুহিনদের ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনা ছিল।

শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার পর তুহিন, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ে বাথরুমে আশ্রয় নিয়ে পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে স্বজনের কাছে তথ্য এসেছে। পরে তারা মারা যান বলে ধারণা করা হচ্ছে। তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করতে পারেননি। উদ্ধারকারীরা বাথরুম থেকে দুই শিশুসহ চারটি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন। তবে ডিএনএ পরীক্ষার আগে সেগুলো তুহিনের পরিবারের সদস্যদের মরদেহ কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

নিহতদের দেহাবশেষ থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একই পরিবারে যে ছয়জন মারা গেছেন, তাদের স্বজন এবং অপর এক নিহতের স্বজন গতকাল ঢাকার মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ সমকালকে বলেন, সাতটি মরদেহের জন্য তাদের পরিবারের চারজন ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। ফরেনসিক বিভাগ এ বিষয়ে কাজ করছে।

ঘটনাস্থলে তদন্ত কমিটি

জেলা প্রশাসনের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। কমিটির সদস্যরা প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যক্তিদের বক্তব্য নেন এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তথ্য সংগ্রহ করেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান তাসনীম জাহান বলেন, রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না। আগুন লাগার কারণ এবং অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট পরিচালনার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিকে আগে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। তদন্ত শেষে অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

রিসোর্ট মালিকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা

এ ঘটনায় রিসোর্টের মালিক মো. তানভীরসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রিসোর্টের মালিক তানভীর ও নেওয়াজ মোর্শেদ রয়েছেন। অন্য আসামিরা অজ্ঞাতনামা। রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে শনিবার বিকেলে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর