আল-জাজিরার বিশ্লেষণ ইরানে হামলা চালানো সহজ, সরকার উৎখাত কঠিন কেন

ইরানের সরকার উৎখাতকে ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে সামরিক শক্তিতে ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করার সক্ষমতা থাকলেও দেশটির সরকার উৎখাত করা ইসরায়েলের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে আল-জাজিরা। এতে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিশ্চিত নয়। আর শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপে সমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু ইরানের সরকার উৎখাতের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার আলোচনা এবং পেন্টাগনপ্রধান পিট হেগসেথের ইসরায়েল সফরের পর তিনি এ বক্তব্য দেন। তবে ইরানের নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করতে নতুন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কিনা, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

বিমান হামলায় কতটা সম্ভব
যুক্তরাজ্যের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষক আরবান কনিংহাম আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের আকাশপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে। দেশটির অস্ত্রের মজুত ও আকাশে উড়ন্ত বিমানে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় সুবিধা দেবে।

তবে সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা আর একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এক বিষয় নয়। বিশ্লেষকদের মতে, বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা গেলেও দেশটির পাল্টা হামলার সামর্থ্য পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন। বিশেষ করে ভূগর্ভে বা সুরক্ষিত স্থানে রাখা অস্ত্র ও সামরিক ব্যবস্থা টিকে যেতে পারে।

আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জাগলার কুর্চ বলেন, ইরানের সরকার উৎখাত করতে হলে স্থলবাহিনী মোতায়েন এবং দীর্ঘ সময় দেশটিতে অবস্থান করার মতো প্রস্তুতি প্রয়োজন। শুধু বিমান হামলা দিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

নেতানিয়াহুও গত মার্চে স্বীকার করেছিলেন, শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে ইরানের সরকার উৎখাত করা সম্ভব নয়। তবে স্থল অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

ইরানেরও পাল্টা হামলার সক্ষমতা রয়েছে
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের নতুন অভিযানের জবাব দেওয়ার মতো সক্ষমতা এখনো ইরানের রয়েছে। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকতে পারে। আকাশপথে হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরানের কিছু অস্ত্রব্যবস্থা কার্যকর থাকবে বলে ধারণা তাদের।

রুসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, ইরানের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্য হতে পারে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি বিমান হামলা থেকে সামরিক সরঞ্জাম সুরক্ষায় সুবিধা দিতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে গিয়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে পারে। তুলনামূলক কম দামের ড্রোন ধ্বংস করতে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এতে ইসরায়েলের অস্ত্রের মজুত ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবার যুদ্ধে জড়াবে
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানে নতুন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত। দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় নতুন করে যুদ্ধ বাড়ানোর রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনের বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের একটি প্রস্তাবে ট্রাম্পের সম্মতি পাওয়া যায়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে সব ধরনের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে গভীরে অবস্থিত সুরক্ষিত স্থাপনায় হামলা চালানোও কঠিন হবে বলে মনে করেন কনিংহাম। ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমান থেকে ব্যবহার করা হয়েছিল ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭ বাংকারবিধ্বংসী বোমা। এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই।

সরকার পরিবর্তনের পথে বড় বাধা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে ব্যবধান। হামলা চালিয়ে সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও তা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকার পতন ঘটে না।

কুর্চের মতে, কোনো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে বিদেশি বাহিনীকে স্থলভাগে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হতে পারে। ইরানের মতো বড় দেশে এমন অভিযান চালানো এবং দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রও কয়েক দশক ধরে চলতে পারে- এমন আরেকটি সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধে জড়াতে চাইবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের আঘাত হানতে পারলেও দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উৎখাত করার সুস্পষ্ট কৌশল এখনো দৃশ্যমান নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অনিশ্চিত থাকা এবং ইরানের পাল্টা হামলার সক্ষমতা বজায় থাকায় নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর