পোল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ক্রাকোর ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্রে বন্দুকধারীর হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ জন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজনের বাড়ি থেকে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারী উগ্র ডানপন্থী ও অতিজাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন।
পুলিশ জানায়, শনিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৩টার কিছু আগে ক্রাকোর ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র মেইন মার্কেট স্কয়ারে গাড়ি নিয়ে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালান এক বন্দুকধারী। প্রায় তিন মিনিট ধরে চলে এই হামলা। এতে ছয়জন নিহত হন। তাদের মধ্যে চারজন নারী ও দুজন পুরুষ। নিহতদের তিনজন পোলিশ নাগরিক, একজন ব্রিটিশ এবং বাকি দুজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
আহত ১৬ জনের মধ্যে অস্ট্রিয়া, জার্মানি, পর্তুগাল, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের পাঁচজন নাগরিক রয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্যও আছেন। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক জানান, সন্দেহভাজন ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ। বাড়িটি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে ওস্ত্রোভিয়েক শভিয়েন্তোক্রজিস্কি এলাকায় অবস্থিত। উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে দুজন নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তারা সন্দেহভাজনের পরিবারের সদস্য হতে পারেন বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
টাস্ক বলেন, পোল্যান্ডে এর আগে এমন ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেনি। ক্রাকোতে মানুষের জীবনের ওপর চালানো এই নিষ্ঠুর হামলাকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবেই অভিহিত করতে হবে।
২৫ বছর বয়সী সন্দেহভাজন ব্যক্তি পোল্যান্ডের নাগরিক। হামলার সময় তার পরনে ছিল সামরিক কৌশলগত পোশাক এবং সঙ্গে ছিল সামরিক ধাঁচের অস্ত্র। তার গাড়ি থেকে আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তিনি পোল্যান্ডের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নন বলে জানিয়েছে সরকার। হামলার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্সিন কিয়েরভিনস্কি বলেন, প্রাথমিকভাবে সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি উগ্র ডানপন্থী আদর্শে আকৃষ্ট ছিলেন। তার মধ্যে অতিজাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল।
হামলার পরপরই ক্রাকো শহরজুড়ে বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাজধানী ওয়ারশসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আগামী ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ক্রাকোতে শোক পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী টাস্ক জানান, হামলাকারীর সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে তা পুলিশকে জানাতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান।
স্থানীয় সময় বিকেল ৩টার কিছু আগে হামলা শুরু হয়। মেইন মার্কেট স্কয়ার ক্রাকোর ঐতিহাসিক কেন্দ্রের একটি সুসজ্জিত চত্বর, যা দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। হামলার সময় গুলিতে আশপাশের দোকানের কাচের সামনের অংশ ভেঙে যায়। একটি ট্রামেও গুলি চালানো হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীর গাড়ি শহরের কেন্দ্র দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে। গুলির শব্দ শুনে মানুষ প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করছেন।
ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা যায়, মানুষ পালানোর সময় বিভিন্ন টেবিল উল্টে পড়ে আছে এবং চারপাশে জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পুলিশ হামলাকারীর গাড়িকে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকধারীর গুলিবিনিময় শুরু হয়।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুই পুলিশ সদস্য গুলিতে আহত হয়েছেন। তাদের একজনের অবস্থা সংকটাপন্ন, অন্যজনের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। তারা হলেন- সিনিয়র কনস্টেবল ইয়াকুব কুলিক ও সিনিয়র কনস্টেবল আর্তুর মোরানস্কি। তাদের সাহসিকতার প্রশংসা করে টাস্ক বলেন, তারা অনেক মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। তাদের প্রকৃত বীর বলেও অভিহিত করেন।
হামলার ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তিনি বলেন, ভয়াবহ এই গোলাগুলির ঘটনায় আমি মর্মাহত ও শোকাহত। নিহতদের পরিবারের সদস্য, আহত ব্যক্তি এবং সহিংসতার শিকার সবার প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে পোল্যান্ডের জনগণের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এই হামলাকে এমন একটি বিয়োগান্তক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার প্রভাব পোল্যান্ডের সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূর পর্যন্ত অনুভূত হবে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। আমি ভুক্তভোগীদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানায়। হামলার পর যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর পোল্যান্ডে ভ্রমণসংক্রান্ত পরামর্শ হালনাগাদ করেছে। ওই এলাকায় অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হামলার সময় ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গুলির শব্দে পুরো চত্বরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ক্রাকোর ২৪ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সেজারি বলেন, প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি শব্দগুলো গুলির। পরে রাস্তায় চারটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পারি।
তিনি আরও বলেন, তখনও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল, অনেক মানুষ চিৎকার করছিলেন। এ সময় একজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা আরেক ব্যক্তিকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে দেখি।
যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল থেকে আসা ক্যাটলিন শ্যাসবি জানান, হোটেলের কক্ষে অবস্থান করার সময় তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান। পরে পুলিশ বাইরের রাস্তা অবরুদ্ধ করে ফেললে তাকে হোটেলের ভেতরেই আশ্রয় নিতে বলা হয়।
পোলিশ সংবাদমাধ্যম ইনের্শিয়াকে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন,আমি গাড়ির চালকের পাশের জানালা দিয়ে গুলি ছুড়তে এবং ধোঁয়া বের হতে দেখেছি। পরে প্রাণভয়ে দৌড়ে মেইন মার্কেট স্কয়ারের পুলিশ স্টেশনে আশ্রয় নিই। সেখানে গিয়ে দেখি, অনেক মানুষ মেঝেতে শুয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন।


