অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন

0
69

নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। কয়েক বছর ধরেই স্মরণকালের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, ডলার সংকট, রিজার্ভের ক্ষয়, বিনিয়োগ খরা, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও অনিয়ম-দুর্নীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের লুটপাট ও অব্যবস্থাপনাসহ অর্থনীতি বিভিন্ন সংকটে নিমজ্জমান। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলবে আগামীবছরের নভেম্বরে।

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে তেমনি সুযোগও তৈরি হবে। তখন আগে যে সুবিধাগুলো বিদ্যমান ছিল, তা আর পাওয়া যাবে না এবং বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা করতে হবে আরও শক্তিশালী দেশের সঙ্গে। এ অবস্থায় শুধু পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে রেমিটেন্স বাড়াতে হলে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। দেশের ব্যাপক তরুণ জনগোষ্ঠী, রপ্তানি খাতের সম্ভাবনা, প্রবাসী আয় এবং ডিজিটাল রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

এজন্য উৎপাদন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। সুশাসন ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ, সংকট, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয় সম্পর্কে সম্প্রতি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহদী আমিন, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সাকিফ শামীম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা। তাদের মতে, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথাযথ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন একান্ত অপরিহার্য।

এক্ষেত্রে নীতি সহায়তা ও সংস্কার, অর্থায়ন, লজিস্টিক খাতের উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি এবং আর্থিক খাত চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ যত সহায়ক হবে রপ্তানি খাতে তত বেশি সাফল্য আসবে। সেই সঙ্গে শুল্কহার বেশি থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যাহত হয়, তাই সহায়ক রাজস্ব নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য স্বল্প সুদে অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে একটি সহায়ক বিনিময় হার নির্ধারণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

একইসঙ্গে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুযোগও তৈরি হবে। তবে সেগুলো মোকাবিলার জন্য আমাদের দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। ড. মাহদী আমিনের মতে, বিএনপির ঘোষিত ৩১-দফা সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা রয়েছে। এর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব।

অর্থনৈতিক অপরাধ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি রোধে আইনি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন- যাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের ডিজিটাল ডিভাইড কমাতে হবে এবং বিনিয়োগের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
ড. মাহদী আমিনের মতে, ৩১ দফার লক্ষ্য হলো, তরুণদের জন্য কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা। কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণরা যেন উদ্যোক্তা হতে পারে, সেজন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। ড. সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে কেবল সাময়িক ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব নীতি এবং কর্মসংস্থান এই তিনটি ক্ষেত্রে গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, উচ্চ মূল্যস্ফীতি।

তিনি মনে করেন, কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, এর জন্য বাজার তদারকি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়ছে। তার মতে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অনেক সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের মহাকাব্য আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে গতানুগতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান আর আগামীর রূঢ় বাস্তবতার মধ্যে এক বিস্তর ব্যবধান দৃশ্যমান হচ্ছে।

গত এক দশকে আমাদের অবকাঠামোগত দৃশ্যপট আমূল বদলে গেলেও অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরে সঞ্চিত সংকটের মেঘগুলো এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ২০২৫ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি, তখন উন্নয়নকে কেবল ইট-পাথরের সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবনযাত্রার মান ও নিরাপত্তার নিরিখে বিচার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here