আগামী বাজেটের রূপরেখা প্রণয়ন করছে সরকার

0
31

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। সে কারণে বাজেটের আকার চলতি বাজেটের মতো রাখার আভাস দেওয়া হয়েছে। আবার ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রপ্তানি, রেমিটেন্স আয় ও উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ সহায়তায় ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে বাজেটের আকার বাড়াতে পারে রাজনৈতিক সরকার। ফলে বাজেটের রূপরেখা প্রস্তুতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বেশ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্রগুলো জানায়, দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি রপ্তানি আয় এখন কিছুটা চাপের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে রেমিটেন্স আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে রিজার্ভে। ডলার সংকট নেই বললেই চলে। আবার গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে তেমন সুখবর নেই। মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক থেকে নেমে আসলেও স্বস্তি ফিরে আসেনি। এ অবস্থায় বাজেট প্রণয়নে কৌশলী ভূমিকা নিতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। কারণ, নতুন বাজেটের আকার ও নীতি চূড়ান্ত করবে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার। চলমান সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্যয় সংকোচন নীতি অব্যাহত রাখার সুপারিশ করা হবে।
নতুন সরকার ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিলে বাজেটের আকার হতে পারে সোয়া আট লাখ কোটি টাকা। আবার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিলে বাজেটের আকার আট লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় নেওয়ার সুযোগও রাখা হচ্ছে। আগামী বাজেটের এডিপির সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে আড়াই লাখ কোটি টাকা। তবে মোট বাজেটের আকার পরিবর্তন হলে এডিপিও সে হারে সমন্বয় হবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজেট প্রস্তুতের জন্য সময় পাবে প্রায় সাড়ে তিন মাস। সেই সময় এ সম্পর্কিত চাপ কমাতে এবং নীতিগত দিক নির্দেশনা দিতে অন্তর্বর্তী সরকার আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়, রাজস্ব ও উন্নয়ন কাঠামো নিয়ে একটি খসড়া রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

এ রূপরেখা চূড়ান্ত বাজেট প্রস্তুত করতে নির্বাচিত সরকারের জন্য সহায়ক হবে। এ লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে সম্প্রতি বাজেট-সংক্রান্ত একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করা হয়। ওই বৈঠকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেই বৈঠকে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট এবং আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার নিয়ে একটি উপস্থাপনা উপস্থাপন করেন অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।

পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি ধারণাও তুলে ধরা হয়। সূত্র জানায়, আর্থিক খাতের দুরবস্থা, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে আরও অন্তত এক বছর ব্যয় সংকোচন নীতি অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছে অর্থবিভাগ। সরকারের সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও এ রকম নীতির কথাই বলা হয়েছে। সবশেষ অনুষ্ঠিত আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে এমন নীতি অবলম্বনের কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করায় গত বছর (২০২৪-২৫) সরকারের পাঁচ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছর একই নীতি অবলম্বন করে সরকার সাশ্রয় করেছিল আড়াই হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ বছরও উল্লেখযাগ্য অঙ্কের সাশ্রয় হবে বলে প্রত্যাশা করছে অর্থবিভাগ। এই বছর বাজেটের আকার কমিয়ে ধরা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া উন্নয়ন-অনুন্নয়ন উভয় খাতের ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরেছে। এজন্য আসছে বছরও কম ব্যয়ের বাজেট দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে অর্থবিভাগ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়।
এটি বাড়িয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন সাড়ে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। দেশে কাঙ্খিত বিনিয়োগ না হওয়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমানো হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। শুরুতে এই বাজেট কাটছাঁট করে সাত লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার চিন্তা ছিল। তবে সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক একীভূতকরণে মূলধন সহায়তা, সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি নানা ক্ষেত্রে সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন আর বড় ধরনের কাটছাঁটের পরিকল্পনা নেই।

ইতোমধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে মূল বাজেটের আকার তেমন না কমলেও সংশোধিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর আকার কমানো  হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রতিবারের মতো এবারও এই কাটছাঁটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার হতে পারে ২ লাখ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নেওয়া হয়েছিল। এর মানে হলো, এবার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমছে। চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির অর্থের মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়া হয় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এটি কমিয়ে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। আর মূল এডিপিতে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে আছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এটি কমিয়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া এবার স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ ৭৪ শতাংশ কাটছাঁট করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা, পরিবহন, ধর্ম ও কৃষিতেও বড় কাটছাঁট করা হয়েছে। তবে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে পরিবেশ, স্থানীয় সরকার ও বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিনের সভাপতিত্বে সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় দুই লাখ কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৭২ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারের কোষাগার থেকে বরাদ্দ ধরা হয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে বড় কাটছাঁটের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এক সচিব বলেন, খুব বেশি কার্যকর না হওয়ায় স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় কর্মসূচি সরকারের সিদ্ধান্তে বাতিল করা হয়েছে।

এখন সেটা প্রকল্প আকারে করা হচ্ছে। এ জন্য এ খাতে বরাদ্দ কমে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকায় খরচ করতে পারবে না- এমন ঘোষণার পরই বরাদ্দ কাটছাঁট করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি এবং সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) তুলনা করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ক্ষেত্রে বরাদ্দের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এডিপির তুলনায় আরএডিপিতে কিছু খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বাড়লেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক খাতে বড় আকারের কাটছাঁট করা হয়েছে। এডিপির তুলনায় আরএডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। এতে বরাদ্দ বেড়েছে ২৮ শতাংশ। এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগে বরাদ্দ বেড়েছে ৮ শতাংশ। এই দুই খাতেই মূলত বরাদ্দ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ৭৭ শতাংশ কমানো হয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণে। ৭৩ শতাংশ কমানো হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া বিদ্যুতে ২৭ শতাংশ, প্রাথমিক শিক্ষায় ২৯ শতাংশ, নৌপরিবহনে ৩৬ শতাংশ, রেলপথ ও কৃষিতে ৩৬ শতাংশ কমানো হয়েছে। এ ছাড়া সেক্টরভিত্তিক বরাদ্দের তুলনায় দেখা যায়, আরএডিপিতে সবচেয়ে বড় কাটছাঁটের শিকার হয়েছে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট খাতগুলো। স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৭৪ শতাংশ, যা ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ হ্রাস। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা খাত, ৭৩ শতাংশ। ৩৫ শতাংশ কমানো হয়েছে শিক্ষা, পরিবহন ও ধর্মে।

অবকাঠামো খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সড়ক পরিবহন খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩৮ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব সংকটের কারণে কিছুটা কমানো স্বাভাবিক হলেও স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষায় এত বড় কাটছাঁট মধ্য মেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, চিকিৎসা অবকাঠামো ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
আরএডিপি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক প্রকল্পে বাস্তবায়নের গতি প্রত্যাশার চেয়ে ধীর, বিদেশি সহায়তার অর্থছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার উন্নয়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যে সময় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ার কথা ছিল, ঠিক সেই সময়ই বরাদ্দ কমানো হতাশাজনক।

তাঁর মতে, এসব খাতে ব্যয় বাড়ালে মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়, পরিবারগুলোর আয় বাড়ে এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছেও অতিরিক্ত সম্পদ পৌঁছায়। অর্থ বিভাগ সম্প্রতি চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের বাজেট বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, জুলাই-সেপ্টেম্বরে এক লাখ চার হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ৯৪ হাজার ৩৯৯ কোটি ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৯৫ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা।

এ ক্ষেত্রে পরিচালন খাতে ৮৪ হাজার ৫৮৬ কোটি ও উন্নয়ন খাতে ১০ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা ব্যয় করে সরকার। এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক  বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়,  মূল্যস্ফীতি বলা হয়েছে, ১২ মাসের গড় হিসাবে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৩ সালের জুনের পর গত নভেম্বরে প্রথমবারের মতো ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। আশা করা যায়, সরকারের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে আগামী জুন শেষে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here