ভালো চাকরি, নিয়মিত আয়, সময়মতো ঋণের কিস্তি সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও কেন বহু মধ্যবিত্ত পরিবার বছরের পর বছর একই আর্থিক বৃত্তে ঘুরপাক খায়? কেন বাড়ে না প্রকৃত সম্পদ, কেন ধনী হওয়ার স্বপ্নটা কেবল স্বপ্নই থেকে যায়? অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে কাজ করে কিছু নীরব কিন্তু ভয়ংকর আর্থিক ফাঁদ, যা বুঝে ওঠার আগেই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আটকে দেয়।
দেখনদারির খরচে সম্পদের মৃত্যু
আয় বাড়লেই জীবনযাত্রার মান হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ানো মধ্যবিত্তদের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। নতুন গাড়ি, বড় বাসা কিংবা দামি গ্যাজেট সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু এই তথাকথিত ‘লাইফস্টাইল আপগ্রেড’ ধীরে ধীরে গ্রাস করে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সক্ষমতা। ফলাফল, মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না থাকে শুধু বিল আর দায়।
একটি আয়ের ওপর অন্ধ নির্ভরতা
একটি চাকরি মানেই নিরাপত্তা এই ধারণা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। চাকরি হারানো, বাজার মন্দা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি এক মুহূর্তেই আয় থামিয়ে দিতে পারে। যাঁরা আর্থিকভাবে এগিয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগেরই একাধিক আয়ের উৎস রয়েছে। সাইড ইনকাম শুরুতে ছোট হলেও সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠতে পারে মূল ভরসা।
বিনিয়োগভীতি ও সুযোগ হারানো
অনিশ্চয়তার ভয় দেখিয়ে বহু মধ্যবিত্তকে বিনিয়োগ থেকে দূরে রাখে। ফলে টাকা পড়ে থাকে সঞ্চয় হিসাবে বা স্বল্প মুনাফার স্কিমে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি নীরবে তার মূল্য কমিয়ে দেয়। বাস্তবতা হলো ঝুঁকি না নিলে বড় লাভও আসে না। সঠিক জ্ঞান ও পরিকল্পনা ছাড়া বিনিয়োগ নয় ঠিকই, কিন্তু ভয় পেয়ে পুরোপুরি দূরে থাকাও সমান ক্ষতিকর।
ভোক্তা ঋণের ফাঁদে আটকে যাওয়া
ক্রেডিট কার্ড বা উচ্চ সুদের ভোক্তা ঋণ তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আর্থিক স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শত্রু। সুদের চাপ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সব পথ বন্ধ করে দেয়। ঋণ নিতেই হলে সেটি হওয়া উচিত এমন খাতে, যেখানে ভবিষ্যতে মূল্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ফেরত দেওয়ার স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।
দক্ষতা উন্নয়নে অনীহা
দ্রুত বদলে যাওয়া অর্থনীতিতে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বহু মানুষ বছরের পর বছর একই দক্ষতা নিয়ে কাজ করে যান, অথচ বাজার চায় নতুন স্কিল। ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কোডিং বা ফ্রিল্যান্সিং এ ধরনের দক্ষতা আয় বাড়ানোর বড় হাতিয়ার হয়ে উঠছে। নিজেকে আপডেট না করলে ক্যারিয়ারও থেমে যায়।
এই পাঁচটি ফাঁদ আলাদা করে খুব ভয়ংকর মনে নাও হতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে এগুলোই মধ্যবিত্তদের ধনী হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। ধনী হওয়া মানে শুধু আয় বাড়ানো নয়; বরং প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আজ একটি অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, নতুন একটি দক্ষতা শেখা কিংবা বিনিয়োগ পরিকল্পনা শুরু করাই হতে পারে আগামীর বড় সাফল্যের ভিত্তি। কারণ প্রকৃত সম্পদ গড়ে ওঠে সাহসী সিদ্ধান্ত আর দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েই।




