নতুন বছরে স্বর্ণ আর তেলের দামে কোনটা উঠবে, কোনটা নামবে?

0
33

২০২০ সালের পর থেকে বৈশ্বিক পণ্যবাজারে একের পর এক অস্থিরতা দেখা গেছে। করোনা–পরবর্তী সরবরাহ সংকট, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি, যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছর চাহিদা ও সরবরাহে বড় ওঠানামা তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালে এই উত্তেজনা কিছুটা কমে এসে বাজারে তুলনামূলক স্থিতি ফিরতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সালে পণ্যবাজার মূলত তিনটি ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। প্রথম ভাগে থাকবে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়তে পারে, পাশাপাশি চীনের ধীরগতির অর্থনীতি চাহিদা সীমিত রাখবে। বিপরীতে সরবরাহ থাকবে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে নতুন প্রকল্প চালু হওয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে তীব্র শীতের আশঙ্কাও কম। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের ভালো ফলনে বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের মজুত বেড়েছে।

এই শ্রেণির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হলো অপরিশোধিত তেল। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অবরোধ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। কারণ, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইবেন। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো উৎপাদন বাড়ালে বাজারে তেলের সরবরাহ আরও বাড়তে পারে। তবে দাম কতটা কমলে আবার চাহিদা বাড়বে—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পণ্য, যার শীর্ষে সোনা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংকট, বাণিজ্যিক ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার দিকে টানছে। ২০২৫ সালে সোনার দাম আউন্সপ্রতি চার হাজার ডলার ছাড়ালেও, ২০২৬ সালে তা সাড়ে চার হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতা এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করতে পারে। ফলে খুচরা বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক—উভয়ই সোনা কেনা অব্যাহত রাখতে পারে। একই সঙ্গে রুপার চাহিদাও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তৃতীয় ভাগে রয়েছে শিল্পধাতু, যাদের গতিপথ পুরো পণ্যবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাতু হলো তামা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বাস্থ্যের সূচক হিসেবে বিবেচিত। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তামা আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণার পর দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল। পরে শুল্ক কেবল তামাজাত পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে—এ ঘোষণায় দাম কিছুটা কমলেও অনিশ্চয়তার কারণে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ২০২৬ সালেও তামার বাজার অস্থির থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুল্কনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে রাখবে। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তা বাড়লে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হতে পারে, যা অন্যান্য মুদ্রায় লেনদেনকারী শিল্পকারখানার ক্রয়ক্ষমতা কমাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সুদের হার কমায়, তাহলে বাজারে ভিন্ন প্রভাবও দেখা যেতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বৈশ্বিক বিক্রি দ্রুত বাড়লে ব্যাটারি, তার ও মোটরে ব্যবহৃত তামার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি সরবরাহ বিঘ্ন, নতুন খনি প্রকল্পে বিলম্ব কিংবা চীনের কারখানাগুলো প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালে বাজারে নতুন গতি আসতে পারে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মত, ২০২৬ সালে পণ্যবাজারে বড় ধরনের উত্তেজনার চেয়ে বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে—তামাসহ শিল্পধাতু বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে পারে নাকি আবার দরপতনের দিকে ঠেলে দেয়, সেদিকেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here