মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকিতেই খরচ হবে প্রায় লাখ কোটি টাকা। এর বাইরে কৃষি ও সারের ভর্তুকিও বাড়বে। নতুন সরকারের নির্বাচিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা বাড়তি ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি না ফেরায় সরকারের আয় বাড়ানোর পথও সীমিত। এ কারণে জরুরি ব্যয়ের বাইরে বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট সংকোচনমূলক রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ অবস্থায় আগামীকাল বুধবার অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলার পথ বের করা ও আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কেমন হবে, তা পর্যালোচনা করতে সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার-সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল এবং বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটি প্রথম বৈঠকে বসছে। আগামীকাল বুধবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি বাড়বে– এমন প্রত্যাশা নিয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য আট লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নের উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করলেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় আয়ের পথ সংকুচিত হলেও ব্যয়ের চাপ পড়ছে। এ অবস্থায় সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়নের চিন্তা থেকে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার আট লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা থেকে আট লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর ব্যবস্থা থেকে পাঁচ লাখ ৩০ লাখ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হতে পারে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং রাজস্ব আয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আয়-ব্যয় পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠেছে। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায় যদি বাজেটের আকার আরও বড় করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পরবর্তী বৈঠকের পর এতে পরিবর্তন আসতে পারে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পর ইতোমধ্যে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় মেটাতে সরকারের গাড়ি কেনা, বিদেশ ভ্রমণ নিষিদ্ধ করাসহ বেশকিছু খাতে ব্যয় সংকোচন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর বাইরে রাজস্ব বাজেটে থাকা থোক বরাদ্দ এবং অন্যান্য খাতে বরাদ্দ থাকা অর্থ কাটছাঁট করে মার্চ-এপ্রিলসহ কয়েক মাসের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া গেলেও মাসের পর মাস সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থার মধ্যে আগামী অর্থবছরে বড় বাজেট প্রণয়ন করলেও রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব হবে না। তাই সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়নের কথা ভাবছেন তারা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে অন্যান্য খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ, বন্ড ইস্যু করে বেসরকারি খাত থেকে ঋণ নিয়ে এবং অর্থ বিভাগের আওতাধীন ‘অপ্রত্যাশিত খাত’-এ বরাদ্দের অর্থ ব্যবহার করে আপাতত ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়া হচ্ছে। তবে এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা আর সম্ভব হবে না। তাই জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে তেলের দাম বাড়ালে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় সংকোচন অপরিহার্য। চলতি সংশোধিত বাজেটে ইতোমধ্যে গাড়ি কেনা, সরকারি অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ বন্ধসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরেও এ ধরনের সাশ্রয়ী পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি উন্নয়ন বাজেটের আওতায় প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে ব্যয় আরও কমানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। যদিও রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে এই আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বহুজাতিক দাতা সংস্থাগুলো থেকেও আগামী অর্থবছরের জন্য উল্লেখযোগ্য বাজেট সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।




