ব্যাংক রেজল্যুশন বিলে নতুন ধারা আগের মালিকের কাছে ফেরার সুযোগ একীভূত পাঁচ ব্যাংকের

0
4

অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে পাস করায় একীভূত ব্যাংক আগের মালিকদের কাছে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একীভূত ব্যাংক পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার এ পর্যন্ত যে অর্থ দিয়েছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করে আগের মালিকরা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এমন ধারা সংযোজনের বিপক্ষে মত দিয়েছিল। বিরোধী দলও সংসদে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তবে ১৮(ক) ধারা সংযুক্ত করেই গত শুক্রবার সংসদে বিলটি পাস হয়।

বিলের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন কিংবা এ আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ার ধারক অথবা শেয়ার ধারকরা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনঃধারণ বা ধারণ করার জন্য রেজল্যুশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে পারবে। তবে শেয়ার পুনঃধারণের আবেদন করার ক্ষেত্রে একটি পৃথক অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।

অঙ্গীকারের মধ্যে থাকবে– ক. রেজল্যুশনভুক্ত হওয়ার আগে বা পরে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব অর্থ পরিশোধ করে ব্যাংক পরিচালনা করতে ইচ্ছুক। খ. বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত নতুন মূলধন জোগান এবং বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। গ. সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য সরকারি, বিধিবদ্ধ সংস্থা বা আধাসরকারি উৎস থেকে দেওয়া ঋণ, ঋণের সুদ অথবা মুনাফা, ইকুইটি, গ্যারান্টি, সব ধরনের আর্থিক সহায়তা বা অন্যান্য সুবিধা সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়া। ঘ. একীভূত হওয়ার আগের আমানতকারী, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক পাওনাদার এবং তৃতীয় পক্ষের বৈধ দাবি ও দায়সমূহ যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। ঙ. সরকারের সব কর এবং করবহির্ভূত রাজস্ব ও অন্যান্য আর্থিক দায় সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করা হবে।

আরও অঙ্গীকার করতে হবে– চ. রেজল্যুশন কার্যক্রম চলাকালীন কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া। ছ. বাংলাদেশ ব্যাংক, আবেদনকারীর নিকট হস্তান্তরের তারিখ থেকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত শেয়ার হস্তান্তর, বিক্রয় বা স্থানান্তর সীমাবদ্ধ রাখার শর্ত আরোপ করলে তা পালন করতে বাধ্য থাকা। জ. ব্যাংকের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন এবং শক্তিশালী করা। ঝ. বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক দেওয়া অন্য যে কোনো শর্ত প্রতিপালন করা।

এই ধারার উপধারা (৩)-এ বলা হয়েছে, আবেদন চূড়ান্তভাবে মঞ্জুরের তিন মাসের মধ্যে পূর্ববর্তী শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনঃধারণ বা ধারণের বাস্তবিক দখল হস্তান্তরের আগে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশের পে-অর্ডার দিতে হবে।

উপধারা (৪) অনুযায়ী, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া বাকি সাড়ে ৯২ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ হারে সরল সুদসহ ফেরত দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, এর মাধ্যমে কেবল সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত ব্যাংককে যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছে তার সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থের পে অর্ডার দিয়ে ব্যাংকের মালিকানায় ফেরা যাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এভাবে একবার কেউ মালিকানা পেলে তাঁকে বাদ দেওয়া সহজ হবে না।

অধ্যাদেশটি কোনো সংশোধনী ছাড়া পাস করতে বিরোধী দল অনাপত্তি দিয়েছিল। কিন্তু যাচাই-বাছাই করে সংশোধিত খসড়া প্রণয়নের জন্য গত ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিম উদ্দিন বিশ্বাসকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চারজন, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের দুজন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিনজন ছিলেন। সাচিবিক দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে।

জানা গেছে, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে ৯৮টি ধারা ছিল। ধারার সংখ্যা কমিয়ে ৭৪টি করার সুপারিশ করে কমিটি। আইনের পরিধি কমানোর জন্য তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি ধারা প্রবিধানে যুক্ত করা হয়।

এ ছাড়া অধ্যাদেশে সামান্য যেসব অসংগতি ছিল, তা সংশোধন করে গত মঙ্গলবার সরকারকে খসড়া কপি দেওয়া হয়। অধ্যাদেশ কিংবা গঠিত কমিটির সুপারিশে ১৮(ক) ধারাটি ছিল না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিলটি সংসদে যাওয়ার আগে এই ধারা যুক্ত করা হয়।

যেভাবে যুক্ত হলো নতুন ধারা
অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের জন্য খসড়া প্রণয়নে গঠিত কমিটির তিনজনের সঙ্গে কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক। তারা জানান, কমিটি গঠনের পর থেকে একটি পক্ষ এ রকম ধারা যুক্ত করার পরামর্শ দেয়। তবে অধিকাংশ সদস্যের আপত্তির কারণে চূড়ান্ত খসড়ায় তা যুক্ত হয়নি। বিল পাসের আগে গত ৯ এপ্রিল রাতে এ রকম ধারা যুক্ত করার বিষয়টি জানতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরদিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে তা না করার অনুরোধ জানানো হয়।

খসড়া প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এরপরও যদি নতুন ধারা যুক্ত করতে হয়, তাহলে এমন কিছু উপধারা রাখার সুপারিশ করা হয়, যাতে কোনো ব্যাংকের দুরবস্থার জন্য দায়ী কেউ আর মালিকানায় ফিরতে না পারে। একই সঙ্গে আমানতকারী, সরকারের দেওয়া অর্থ এবং অন্য পাওনাদারের সব দায় পরিশোধের পর মালিকানা নেওয়ার শর্ত যুক্ত করতে বলা হয়। তবে তা না করে পুরো দায় পরিশোধের অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে শেয়ার ফেরত দেওয়ার বিষয়টি আইনে যুক্ত করা হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কেন এটা করা হচ্ছে তা পরিষ্কার নয়। নিশ্চয় এর ফল ভালো হবে না।

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের অবস্থা
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আলোকে গত বছর শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক ফার্ম দিয়ে অডিটসহ বিভিন্ন পর্যায় শেষে এ সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ধার হিসেবে দিয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকের চাঁদায় গড়ে ওঠা আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পুরো অর্থ যেন তুলতে পারেন, সে জন্য আলাদা একটি স্কিম ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ঋণের ৮৪ শতাংশ খেলাপি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। আর দেশের পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল দুই লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি এই পাঁচ ব্যাংকে।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে এক্সিম ব্যাংক। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির ৫৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে ২২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। একীভূত হওয়ার আগে এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। বাকি চার ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।

চার ব্যাংকের মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণের ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ এখন খেলাপি। মূলধন ঘাটতি ২৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ খেলাপি। মূলধন ঘাটতি ৬৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ খেলাপি। মূলধন ঘাটতি ১৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। আর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩৮ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ৭৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি। মূলধন ঘাটতি ২২ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here