মার্চে রপ্তানিতে বড় পতন

0
5

আরও কিছুটা গতিহীন হয়ে পড়েছে দেশের রপ্তানি খাত। গত মার্চ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গত ৯ মাসে আর কোনো মাসে এত বড় ব্যবধানে রপ্তানি কমেনি। এ নিয়ে গত আট মাস টানা রপ্তানি কমলো। দেশের রপ্তানির ইতিহাসে কখনও টানা আট মাস রপ্তানি কমার নজির নেই।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল বৃহস্পতিবার হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, গত মার্চ মাসে রপ্তানির পরিমাণ ৩৪৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। গত বছরের মার্চ মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে ৭৭ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। সাধারণত মাসে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে।

রপ্তানির এই টানা পতনের কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্কিন পাল্টা শুল্ক এবং শুল্ক কেন্দ্র করে প্রতিযোগী দেশগুলো জোটগত প্রধান বাজার ২৭ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে অগ্রাসী রপ্তানি বাণিজ্য করছে। কম দামে পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছে ওই দেশগুলোতে। এ কারণে গত ৮ মাস ধরেই বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে। এসব কারণের সঙ্গে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে
গড়ে ১০ দিনের মতো কারখানা বন্ধ ছিল। এ কারণে মার্চের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় ধরে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। মূলত এ কারণেই এত বেশি হারে রপ্তানি কমেছে মার্চ মাসে।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ সময় মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ তিন হাজার ৫৩৯ কোটি ডলারের মতো। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল তিন হাজার ৭৭২ কোটি ডলারেরও কিছু বেশি।

জুলাই মাসে অস্বাভাবিক বেশি রপ্তানির কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত কারখানায় রাত-দিন কাজ করে পণ্য জাহাজীকরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তারা। ব্র্যান্ড-ক্রেতারাও বাড়তি শুল্ক এড়াতে আগাম আমদানিতে আগ্রহী। এ কারণে ওই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রপ্তানি হয়। গত বছরের ৩১ জুলাই ওয়াশিংটনের ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশের পণ্যের পাল্টা ২০ শতাংশ শুল্ক ৭ আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিটে কার্যকর হয়। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি বেশি হয় ২৫ শতাংশের মতো।
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাসে আগস্ট থেকেই পণ্য রপ্তানিতে কিছুটা হোঁচট আসে। এরপর আগস্টে আয় কমে যায় ৩ শতাংশের মতো। তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরও সেই ধারাই চলে। মাসটিতে রপ্তানি আরও কমে যায় ৫ শতাংশের মতো। অক্টোবর মাসে রপ্তানি কম ৭ শতাংশ। নভেম্বর মাসে রপ্তানি কম হয় ৬ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি কম হয়েছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। জানুয়ারি মাসে রপ্তানি হ্রাসের গতি কমে কিছু কমে আসে। রপ্তানি কম হয় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা আধা শতাংশ। ফেব্রুয়ারি মাসে রপ্তানি কমে ১২ শতাংশ।

ইপিবির তথ্যউপাত্ত বলছে, গত মার্চে গড়ে যে হারে মোট রপ্তানি আয় কমেছে তার চেয়ে বেশি হারে কমেছে প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানি। মাসটিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় কমে গেছে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ২৭৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। গত বছরের মার্চ মাসে এই পরিমাণ ছিল ৩৪৫ কোটি ডলারের মতো। অর্থাৎ একক পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ৬৭ কোটি ডলার। অর্থবছরের গত ৯ মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় এসেছে দুই হাজার ৮৫৮ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল তিন হাজার ২৫ কোটি ডলার।
মার্চ মাসে বড় অঙ্কে রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামসুদ্দিন সমকালকে বলেন, রোজার ঈদের কারণে ১০ দিনের মতো কারখানা বন্ধ ছিল। এই ১০ দিনের রপ্তানি কম হয়েছে মার্চ মাসে। পোশাক খাতের সাধারণত বছরের দুই ঈদে লম্বা ছুটি থাকে। এটা তো একটা কারণ মার্চের রপ্তানির ক্ষেত্রে। তবে যেসব কারণে গত আট মাস ধরে রপ্তানি কমছে সে সব কারণের প্রভাব মার্চ মাসের রপ্তানিতেও ছিল। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী মার্কিন পাল্টা শুল্কের প্রত্যক্ষ প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমছে। সেখানে চাহিদা কমছে। আর পরোক্ষ প্রভাব হিসেবে রয়েছে চীন, ভিয়েতনাম, ভারতের মতো দেশগুলো ইইউতে আগ্রাসী রপ্তানি কার্যক্রম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা শুরু হয়েছে কবে নাগাদ তার সুরাহা হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে দেশে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে এসব কারণে রপ্তানি খাতের জন্য শিগগিরই কোনো সুখবর দেখা যাচ্ছে না।

ইপিবির তথ্যউপাত্ত বলছে, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে অন্যান্য বড় পণ্যের রপ্তানিতেও একই গতি। হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি কমছে ২১ শতাংশ। ওষুধের রপ্তানি কমেছে ২০ শতাংশ। সবজি রপ্তানি কম হয়েছে ৪৫ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৭ শতাংশ। পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম হয়েছে ১৩ শতাংশ। তবে কয়েকটি পণ্যের রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে। যেমন হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি বেড়েছে ৫ শতাংশের মতো। কাঁকড়ার রপ্তানি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৬ শতাংশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here