সম্পদ ও উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে কর আরোপের পরিকল্পনা

0
4

দেশে রাজস্ব আয় বাড়াতে ও বৈষম্য কমাতে সারচার্জের পরিবর্তে ওয়েলথ ট্যাক্স বা সম্পদ কর এবং ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ওপর কর আরোপের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে অতি ধনীদের ওপর আয়করের হার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ হতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর আয়োজিত আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় এসব কথা জানান এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। গতকাল সকালে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন নোয়াব ও অ্যাটকো এবং বিকেলে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনার আয়োজন করা হয়। ইআরএফের সঙ্গে আলোচনায় সংগঠনের সভাপতি দৌলত আকতার মালা ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমসহ সংগঠনের সিনিয়র সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নোয়াব ও অ্যাটকোর নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ওয়েলথ ট্যাক্স (সম্পদ কর) আইনকে নিয়ে আসার চিন্তা করা হচ্ছে। এতে সম্পদশালী করদাতাদের থেকে আয়করের বাইরে সারচার্জের পরিবর্তে আরও কিছু ওয়েলথ ট্যাক্স বা সম্পদ কর পাওয়া যাবে, যা রাজস্বকে সহায়তা করবে।

উত্তরধিকার সম্পত্তিতে কর
উত্তরধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে কর আদায়ের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘কিছু ভাগ্যবান সন্তান তাদের পূর্বপুরুষদের থেকে অনেক প্রপার্টি ইনহেরিট করে। বিভিন্ন দেশে ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স আছে। বাংলাদেশেও এই উত্তরাধিকার কর বসানোর বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। অত্যন্ত দামি প্রপার্টি অথবা সিটি করপোরেশন এলাকায় যেসব প্রপার্টি আছে, সেগুলো যখন মূল মালিকের থেকে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করা হবে, তার আগেই এই কর বসানো হবে।
অনুষ্ঠানে রাজস্ব আদায় বাড়াতে দুর্নীতির পথ বন্ধ করার ওপর জোর দিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে, প্রত্যেক জায়গায় সৎ, দক্ষ এবং পরিশ্রমী কর্মকর্তাদের নার্সিং করতে পারলে, তাদের সাহস জোগাতে পারলে অটোমেটিক্যালি কর ফাঁকি কমবে। রাজস্ব আদায় বাড়বে।

সারা বছর আয়কর রিটার্ন দেওয়া যাবে
আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছরই অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দেওয়া যাবে জানিয়ে আবদুর রহমান খান বলেন, প্রতিবছর জুন শেষে পরবর্তী নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। চলতি বছর কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ৩১ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে একটা নিয়মের মধ্যে সারাবছর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ করবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন জমা দিলে করদাতাদের জন্য বিশেষ সুবিধাও থাকবে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে দিলে কোনো জরিমানা লাগবে না। তৃতীয় প্রান্তিকে জমা দিলে জরিমানাসহ রিটার্ন জমা দিতে হবে।
ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করতে এনবিআরের উদ্যোগ তুলে ধরে আবদুর রহমান খান বলেন, কাস্টমসের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড ফ্যাসিলিটি বাড়াতে চায় সরকার। এ জন্য ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো শুধু চালু নয়, এটাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটা এখন খুব ভালোভাবে কাজ করছে। ব্যবসায়ীদের আরেকটা সমস্যা ছিল তাদের বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে। গত জানুয়ারি থেকে টোটাল বন্ড ম্যানেজমেন্ট অটোমেটেড করা হয়েছে। এ ছাড়া অডিট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ম্যানুয়াল পদ্ধতি বন্ধ করা হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের তথ্য তুলে ধরে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গত অর্থবছরের চেয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় হয়েছে। রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত করতে আয়কর, শুল্ক এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত তিনটি আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। আশা করা যায়, চলতি বছরে বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি বেশি হবে।

কর বাড়তে পারে যেসব ক্ষেত্রে
ইআরএফের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অতি ধনী অর্থাৎ যাদের বার্ষিক আয় এক কোটি টাকা, দেড় কোটি টাকা কিংবা পাঁচ কোটি টাকার বেশি– তাদের ওপর বর্ধিত কর হার চালু করার পরিকল্পনা আছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরের বছর অর্থাৎ ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে এটি কার্যকর করার জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাবনা দেওয়া হবে।
আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যের দাম কম উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আগামী বাজেটে তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়ানো হবে। তামাকজাত পণ্যে নতুন স্কিম প্রণয়ন ও কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস, চোরাচালান ও জাল স্ট্যাম্পের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে জব্দকৃত পণ্য জনসমক্ষে ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চোরাই সিগারেট বন্ধে উন্নত বিশ্বের মতো সিগারেটে প্যাকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, তামাকপণ্যে এখন পর্যন্ত চারটি লেয়ারে দাম আছে। এতে ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত ট্যাক্স আছে। বিড়ি এবং গুলে ব্যাপক কর ফাঁকি হয়। নকল সিগারেট শনাক্ত করতে সিগারেটে এয়ার কোড এবং কিউআর কোড চালু করা হবে।

ইআরএফের প্রস্তাবনা
প্রাক-বাজেট আলোচনায় আগামী বাজেটে নিত্যপণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা উপকরণে করহার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত রাখা এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কমাতে এমএফএসের মাধ্যমে অতিরিক্ত কর ফেরতসহ ৩২টি প্রস্তাবনা দিয়েছে ইআরএফ।
ইআরএফের প্রস্তাবনায় আরও রয়েছে– মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে পৃথক রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং সহজে বন্ড সুবিধা প্রদান, বেসরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ড করমুক্ত রাখা, কর-জিডিপি হার নিয়ে এনবিআর-ইআরএফ যৌথ জরিপ চালু করা, ব্যক্তি করদাতার সর্বোচ্চ করহার ৩০-৩৫ শতাংশ ও ভ্যাটের একক হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা।

এ ছাড়া ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক ও মুনাফার কর হ্রাস বা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত প্রত্যাহার, ঋণ অনুমোদনের আগে এনবিআর ডাটাবেজ থেকে ব্যবসায়িক তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করা, বাজারমূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পদ কর আদায়, এনবিআরের তিনটি বিভাগের জন্য পৃথক হেল্পলাইন চালু, করছাড় প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব ক্ষতির প্রাক্কলন প্রকাশ, অনিবাসীদের সেবার ওপর উৎসে করহার পুনর্বিবেচনা ও এনবিআর ভবনে মিডিয়া সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে ইআরএফ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here