আগুনে পোড়া গ্যাসলাইটার কারখানার সামনে সারাদিন মায়ের খোঁজ না পেয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন রাতে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) মর্গে যান। পোড়া অজ্ঞাত লাশগুলোর মধ্যে তিনি মায়ের মরদেহ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু লাশগুলো এতটাই পুড়ে গেছে, চেনা যাচ্ছিল না।
হঠাৎ একটি লাশের হাতের দিকে তাঁর নজর যায়। পুড়ে কঙ্কাল হয়ে যাওয়া সেই লাশটির হাতের মুঠোয় ছিল একটি চাবির গুচ্ছ। ঘরের আলমারি ও ড্রয়ারের চাবি সব সময় তাঁর মায়ের কাছেই থাকত। চাবির রিংয়ে মায়ের ওড়নার পোড়া অংশ আটকে থাকতে দেখে সন্দেহ আরও বাড়ে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুলিশের সহায়তায় তিনি গভীর রাতে ওই চাবিগুচ্ছ নিয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলীর শহীদনগরের বাসায় ছুটে যান। সেখানে একে একে চারটি চাবি দিয়ে চারটি তালা খুলে ফেলেন। এভাবেই ২৬ বছর বয়সী সাব্বির নিশ্চিত হন, এটাই তাঁর মা মঞ্জু বেগমের (৪৯) মরদেহ।
মঞ্জু বেগম ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকার আমবাগিচার এস আর গ্যাসলাইটার কারখানায় শনিবার প্রথম কাজে যান। অগ্নিকাণ্ডে তিনিসহ ছয় শ্রমিক নিহত হন। আহত ও দগ্ধ হন আরও কয়েকজন।
কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনের মধ্যে তিনজনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। গতকাল রোববার স্বজনের কাছে এসব লাশ হস্তান্তর করা হয়। তিনজনই ওই কারখানারশ্রমিক ছিলেন। বাকি তিনজনের মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে রাখা হয়। এর আগে মিটফোর্ড মর্গে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট ওই তিন মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে।
অগ্নিকাণ্ড ও শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল পুলিশ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেছে। এ মামলায় কারখানাটির মালিক পক্ষের সহযোগী ও স্থানীয় বিএনপি নেতা ইমান উল্লাহ ওরফে মাস্তানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি কেরানীগঞ্জ শিট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি। কারখানার মালিক আকরাম উল্লাহ আকরামসহ অপর আসামিরা পলাতক।
আগানগর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদ খান সমকালকে বলেন, ‘আমি শুনেছি, ইমান উল্লাহ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সদস্য।’
মঞ্জু বেগম ছাড়া শনাক্ত হওয়া অপর দুজন হলেন– শাহীনুর বেগম (৩৫) ও মিম আক্তার (১৬)। মঞ্জু বেগমের ছেলে কদমতলীর ফুটপাতে আখের রস বিক্রেতা সাব্বির হোসেন সমকালকে বলেন, ‘পুড়ে যাওয়ায় মায়ের চেহারা বোঝার উপায় নেই। মায়ের ওড়নার পোড়া অংশ দেখে এবং চাবি দিয়ে তালাগুলো খুলে যাওয়ার পর বুঝতে পারি এটাই আমার মায়ের লাশ।’ মঞ্জু বেগমের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কবিরকাটি এলাকায়। গতকাল বিকেলে স্বজন তাঁর লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
শনিবার সন্ধ্যায় মিটফোর্ড মর্গে গিয়ে মিম আক্তারের লাশ শনাক্ত করেন তার বাবা নিরাপত্তাকর্মী দেলোয়ার হোসেন। তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালে। আমবাগিচায় ভাড়া থাকতেন। শাহীনুরের লাশ গতকাল সকালে শনাক্ত করা হয়। শাহীনুর বেগমের বাড়ি মাদারীপুরে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের গোলামবাজার এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। তাঁর বাবা আজিজ কাজী জানান, মেয়ের চুলের খোঁপার ক্লিপ দেখে তিনি মরদেহ শনাক্ত করেন।
শনিবার দুপুর ১টার পর কেরানীগঞ্জের আমবাগিচায় গ্যাসলাইটার তৈরির টিনশেডের কারখানায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিকেল পৌনে ৫টায় আগুন নেভান। তল্লাশি করে ছয় শ্রমিকের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করেন তারা। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় উদ্ধার কার্যক্রম সমাপ্তি ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি সাইফুল আলম জানান, গতকাল তিনজনের লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিএনএ ম্যাচিং করে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বাকি তিনজনের লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ওসি বলেন, অগ্নিকাণ্ড, হত্যা ও শ্রম আইনে কারখানার মালিক আকরাম, তার ছেলে আহনাফ আকিব এবং সহযোগী ইমান উল্লাহ ওরফে মাস্তানসহ অজ্ঞাত ছয়-সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ইমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপর আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
অগ্নিকাণ্ড ও নিহতের ঘটনায় ঢাকা জেলা প্রশাসন ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ৫ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
আগুনে ছয় শ্রমিক নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) (মার্কসবাদী)। এটিকে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ উল্লেখ করে অবিলম্বে শ্রমিক হত্যার যথাযথ তদন্ত করে দায়ী কারখানা মালিকসহ রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থার অবহেলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের দাবি জানায় দলটি।
গতকাল দলের সমন্বয়ক মাসুদ রানা এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানান।




