খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় ঘেরের আইলে লাউ আবাদে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন কৃষক। বর্তমানে এ উপজেলায় মৌসুমে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার লাউ বিক্রি করছেন চাষিরা। মাছের পাশাপাশি লাউ আবাদে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেয়ে সচ্ছল হয়েছে অনেক পরিবার। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে কয়েক হাজার নারী-পুরুষের।
ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের সাজিয়াড়া গ্রামের যুবক রকিবুল ইসলাম। তিনি সাজিয়াড়া বিলে এক বিঘা জমিতে মাছ চাষ করেন। গত বছর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ওই ঘেরের আইলে ২১০টি লাউয়ের মাদা তৈরি করে বীজ বপন করেন এবং ঘেরের পানির ওপর বাঁশ দিয়ে মাচা তৈরি করেন। বীজ বপনের ৫০ দিনের মধ্যে গাছে লাউ আসতে শুরু করে। রকিবুল ইসলাম জানান, ঘেরের আইলে লাউ আবাদ ও বাঁশের মাচা তৈরি করতে তাঁর ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ পর্যন্ত তিনি ৫৫ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। এ মৌসুমে আরও ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তিনি জানান, লাউ বিক্রি করতে কোনো বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না। ফড়িয়ারা সরাসরি ঘের থেকে নগদ টাকায় লাউ কিনে নিয়ে যায়। এ জন্য বাড়তি কোনো খরচ হয় না তাঁর।
কুলবাড়িয়া গ্রামের প্রসেনজিৎ মণ্ডল বিলে ছয় বিঘা জমিতে মাছ চাষ করেছেন। ওই ঘেরের বেড়িবাঁধের আইলে ৩০০ লাউয়ের মাদা তৈরি করে সেখানে বীজ বপন করেছিলেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা। লাউ বিক্রি করেছেন দুই লাখ ১৫ হাজার টাকার। এতে তিনি খুব খুশি।
খর্নিয়া গ্রামের কৃষক আবু হানিফ বলেন, মাছের ঘেরের আইলে ১৫০টি মাচা তৈরি করে সেখানে লাউ চাষ করেন। সব মিলে তাঁর ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে তিনি প্রায় দেড় লাখ টাকা লাভ করেছেন।
গুটুদিয়া গ্রামের চিংড়ি চাষি আতাবুর রহমান জানান, চিংড়িঘেরের বাঁধে লাউয়ের পাশাপাশি টমেটো, ঝাল (মরিচ) চাষ করা হয়। এতে তারা পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হচ্ছেন।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান জানান, ডুমুরিয়ায় ১৮ হাজার ৭১২টি গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। অধিকাংশ চিংড়ি বেড়িবাঁধের ওপর মাছ চাষিরা লাউয়ের আবাদ করে থাকেন। মাছের পাশাপাশি সবজি চাষে তারা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (সদ্য বদলি হওয়া) ইনছাদ ইবনে আমিন বলেন, ডুমুরিয়ায় গত শতকের ৯০-এর দশক থেকে বাণিজ্যিকভাবে বেড়িবাঁধের আইলে লাউ চাষ শুরু করা হয়। উপজেলার ডুমুরিয়া সদর, রংপুর, খর্নিয়া, ভান্ডারপাড়া, আটলিয়া, শরাফপুর, গুটুদিয়া ও শোভনা ইউনিয়নে বেশি লাউ চাষ হয়ে থাকে। মাছের ঘেরের বেড়িবাঁধে লাউ চাষ করে বহু কৃষক লাভবান হচ্ছেন। লাউ চাষে উৎসাহিত করতে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সারসহ নানামুখী উপকরণ বিতরণ করা হয়।
আটলিয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুল হালিম মুন্না জানান, মাছের ঘেরের বেড়িবাঁধের পরিত্যক্ত জায়গায় লাউ চাষ করে হাজারও কৃষকের অর্থনৈতিক ভাগ্য বদল হয়েছে।
শরাফপুর ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের ভ্যানচালক প্রশান্ত কুমার রায় ও নৌকার মাঝি আমির হোসেন গাজী জানান, বিল ও ঘেরে লাউ আবাদের কারণে অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। তারা কৃষকের ক্ষেত থেকে বাজারে লাউ পরিবহন করে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৫০০-৬০০ টাকা আয় করতে পারেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক লাউয়ের বাজার গড়ে উঠেছে। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক ঘেঁষে ডুমুরিয়া উপজেলা সদরে চারটি বাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লাউ বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া মহাসড়কসহ গ্রামীণ সড়ক ঘেঁষে ১৬টি বাজার গড়ে উঠেছে।
ডুমুরিয়ার ‘আল্লাহর দান’ কাঁচা বাজারের আড়ত মালিক মো. মিজান সরদার, মতিউর রহমান শেখ ও মামুন জোয়ার্দার বলেন, ডুমুরিয়ায় প্রায় বার মাসই লাউ চাষ হয়ে থাকে। প্রতিদিন তাদের আড়তে দুই থেকে তিন লাখ টাকার লাউ বেচাকেনা হয়ে থাকে। প্রতি মৌসুমে আড়ত মালিকরা কয়েক কোটি টাকার লাউ বেচাকেনা করে থাকেন।
কৃষিবিদ ইনসাদ ইবনে আমিনের দেওয়া তথ্যমতে, ডুমুরিয়ার ২২৬ গ্রামে লাউ উৎপাদন হয়। প্রতিবছর এ উপজেলায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার লাউ বেচাকেনা হয়। গত বছর ৩০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়েছিল। এতে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা আয় হয়। এ বছর প্রায় ৩২০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়েছে। এতে কমপক্ষে ৪৬ কোটি টাকার লাউ বিক্রি হবে।




