ঢাকার অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক সাড়া

0
5

রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনতে বাংলাদেশের বিশেষ ছাড়ের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে এ আশ্বাস দেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের সংকট নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় তিনি রাশিয়া থেকে সরাসরি পরিশোধিত ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ ছাড় পাওয়ার অনুরোধ জানান। এর আগেও বাংলাদেশ একই অনুরোধ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চিঠি দিয়েছিল।

বৈঠকে খলিলুর রহমান বলেন, কৃষকরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং খাদ্য নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য এ ছাড় প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এর আগে রাশিয়ার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী যে ছাড় দিয়েছিল, তার সুফল বাংলাদেশ নিতে পারেনি।’

এ ছাড়া, জরুরি চাহিদা মেটাতে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের বিনিময়ে পরিশোধিত তেল কেনার বিষয়েও দুজন আলোচনা করেন। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী বাংলাদেশের বর্তমান  জ্বালানি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে এ কঠিন সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন সরকারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি আশ্বাস দেন, তাঁর দপ্তর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মার্কিন সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে কাজ করবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর প্রথম ভারত সফর করতে যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি মরিশাসে যাওয়ার পথে ভারতে যাত্রাবিরতি নেবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, আগামী ১০ থেকে ১২ এপ্রিল মরিশাসে নবম ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স (আইওসি) হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষে এতে যোগ দেবেন খলিলুর রহমান। আইওসিতে যোগ দেওয়ার আগে ভারতে যাত্রাবিরতি নেবেন তিনি। ৭ এপ্রিল ভারতের উদ্দেশে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখান থেকে ৯ এপ্রিল মরিশাসের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।

জ্বালানি তেলের লাইন এখনও দীর্ঘ
রাজধানীতে জ্বালানি তেলের জন্য প্রতীক্ষার দীর্ঘ লাইন এখনও কমেনি। নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকেই মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের সারি চোখে পড়ছে। সাম্প্রতিক সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে সংকটের চাপ পুরোপুরি কাটেনি।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহের কারণে পাম্পগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের চাপ আরও বাড়ছে। অনেক চালক ভোর ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও দুপুর পর্যন্ত তেল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের ভোগান্তি বেশি, কারণ স্বল্প পরিমাণ তেল নিয়েই তাদের বারবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। পরিবহন চালকরাও বলছেন, তেলের অভাবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী যানবাহন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিভিন্ন স্থানে হামলা-হামলা, মারামারি
দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় কালোবাজারিদের ড্রামে তেল না দেওয়ায় একটি ফিলিং স্টেশনে হামলা হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন স্টেশন মালিকসহ তিনজন। ঘটনার পর বুধবার সকাল থেকে সংশ্লিষ্ট মালিকের দুটি ফিলিং স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ঢাকা-খুলনা ও ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন এবং সেচনির্ভর কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

গাইবান্ধায় রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার ১৬ দিন পরও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। জেলার বিভিন্ন পাম্পে তেল না পাওয়া এবং দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার দৃশ্য এখনও নিয়মিত। একই চিত্র নেত্রকোনায়ও দেখা যাচ্ছে। সেখানে অধিকাংশ পাম্প দিনে বন্ধ থাকে, আর যেগুলো খোলা থাকে সেগুলোও সীমিত সময় তেল বিক্রি করে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও মারামারির ঘটনাও ঘটছে।

প্রশাসনের অভিযান জোরদার
অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানও জোরদার হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ ডিজেল জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়ায় পৃথক অভিযানে তিন হাজার লিটারের বেশি জ্বালানি তেল জব্দ করা হয় এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়। সিরাজগঞ্জ ও গোপালগঞ্জে জরিমানা ও দণ্ডাদেশের ঘটনা ঘটেছে।

সংকট মোকাবিলায় কিছু এলাকায় নতুন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। রাজবাড়ীর পাংশায় পরীক্ষামূলকভাবে অ্যাপের মাধ্যমে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে তেল নিতে হলে চালকের নাম, গাড়ির লাইসেন্স, নম্বরপ্লেটসহ বিস্তারিত তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। একাধিকবার বা অপ্রয়োজনে তেল নেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। প্রথম দিনেই একাধিক চালককে চিহ্নিত করে জরিমানা করা হয়েছে।

মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি 
জ্বালানি তেলের মান যাচাই নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন বলছে, বর্তমানে পাম্প পর্যায়ে তেলের মান পরীক্ষা করা হলেও ডিপো পর্যায়ে একইভাবে কঠোর যাচাই করা হয় না। ফলে তেলের মান খারাপ হলে দায় কার ডিপো না পাম্পের তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় তারা প্রথমে ডিপো থেকে তেল সরবরাহের সময় মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন।

সংগঠনটির দাবি, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা পাম্পে এসে তেলের মান নিয়ে অভিযোগ করেন, যা নিয়ে বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা সৃষ্টি হয়। এতে পাম্প মালিকরা অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে তারা মনে করেন। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, একই তেলের নমুনা ডিপো ও পাম্প দুই পর্যায়েই পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত সমস্যা কোথায় তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here