কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে নেই– এই কথাটি আমার মন মানতে চায় না। যেন হঠাৎ করেই সংগীতের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর গান শুনে বড় হয়েছি। তাঁর কণ্ঠ ছিল ঠিক ভোরের পাখি ডাকার মতো– স্বচ্ছ, প্রাণবন্ত আর হৃদয়ছোঁয়া। কিন্তু জীবনে দুবার তাঁকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, যা আমার কাছে আজও অমূল্য স্মৃতি হয়ে আছে।
কলকাতায় ‘অন্যায় অবিচার’ সিনেমার গানের রেকর্ডিংয়ে গিয়েছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল, যেন বিশাল এক সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আর আমি তার ক্ষুদ্র একটি ঢেউ মাত্র। সেখানে আমার গান শুনে তিনি যে প্রশংসা করেছিলেন, তা আমাকে একদিকে যেমন লজ্জিত করেছিল, অন্যদিকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিতও করেছিল। তিনি উপস্থিত সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মণকে বলেছিলেন, ‘সিনেমার জন্য আপনার নির্বাচন খুব ভালো হয়েছে, সুন্দর একটি কণ্ঠ পেয়েছেন। সাবিনা ইয়াসমিন খুব ভালো গেয়েছে।’ তাঁর মুখে এমন কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল, যেন শুকনো মাটিতে হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে।
ওই কাজটিতে কিশোর কুমারের সঙ্গে একটি যুগল গান ও একটি একক গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। হিন্দি ও বাংলা– দুই ভাষাতেই কাজ করেছি। কিন্তু যত বড় শিল্পীই হোন না কেন, আশা ভোঁসলের মতো এত সহজ-সরল মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। তিনি ছিলেন ঠিক নদীর জলের মতো– নির্মল, প্রবহমান এবং সবাইকে আপন করে নেওয়ার মতো উদার। তাঁর সঙ্গে কিছু সময় কাটালেই বোঝা যেত, তিনি কতটা মাটির মানুষ।
ঢাকায় তাঁর সঙ্গে আরেকটি স্মরণীয় সাক্ষাৎ আমার হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। একবার তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে তাঁর গান শুনতে গিয়েছিলাম। সামনে বসে তাঁর গান শুনছিলাম আর মনে হচ্ছিল, আমি যেন সুরের এক অদৃশ্য জগতে ভেসে যাচ্ছি। তাঁর কণ্ঠ ছিল ঠিক সন্ধ্যার নরম বাতাসের মতো– শ্রোতার মনকে ছুঁয়ে যায় নিঃশব্দে। পরে মঞ্চের পেছনে দেখা হলে তিনি বললেন, ‘তোমাদের গান খুব বেশি শোনার সুযোগ পাই না। তবে কিছু গান শুনেছি, খুব ভালো লেগেছে। তোমার কিছু গান শ্রোতার মুখেও ফিরে।’ তিনি প্রশংসা করেই যাচ্ছিলেন আর আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আমি কি সত্যিই এতটা প্রাপ্য?
তাঁর বহুমুখী প্রতিভার জন্য তিনি সর্বত্রই সমাদৃত ছিলেন। গণমাধ্যমে তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী গায়িকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আট দশকের বেশি সময় ধরে বিস্তৃত তাঁর কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় চলচ্চিত্র এবং অ্যালবামের জন্য অসংখ্য গান রেকর্ড করেছেন। তাঁর অর্জনের ঝুলি ছিল এক বিশাল আকাশের মতো, যেখানে তারার মতো জ্বলজ্বল করে অসংখ্য সম্মাননা।
চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ভারত সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ প্রদান করে সম্মানিত করে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে সংগীত ইতিহাসের সর্বাধিক রেকর্ডকৃত শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। শ্রেষ্ঠ মহিলা নেপথ্য গায়িকা হিসেবে রেকর্ড সাতটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে। এ ছাড়া তিনি দুটি গ্র্যামি মনোনয়ন পেয়েছিলেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন ঠিক এক বিশাল বটগাছের মতো, যাঁর ছায়ায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম আশ্রয় পেয়েছে। তাঁর প্রয়াণে উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনে যেন এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
৯২ বছর বয়সে তাঁর এই বিদায় যেন একটি অধ্যায়ের অবসান। মনে হয়, সংগীতের আকাশে আজ এক চিরন্তন নীরবতা নেমে এসেছে। তবুও তাঁর গান রয়ে যাবে– ঠিক সকালের সূর্যের আলোর মতো, যা প্রতিদিন নতুন করে আমাদের হৃদয় আলোকিত করবে।
আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই– যেখানেই থাকুন, খুব ভালো থাকুন। আপনার সুর, আপনার কণ্ঠ, আপনার স্মৃতি– সবকিছু আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।




