ইরান ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা হলে কী ঘটতে পারে বিপর্যয় নামবে হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যবস্থায়

0
2

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। এই হামলা যদি কার্যকর করা হয়, তবে তা ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে নামতে পারে ব্যাপক অস্থিরতা। একদিকে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসবে বিপর্যয়, অন্যদিকে পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের পানি ও জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলা বেড়ে যাবে। গতকাল সোমবার ইরান ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণে এসব কথা বলা হয়।

গত রোববার ট্রাম্প জোর সতর্ক করে বলেন, মঙ্গলবারের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। তেহরান এই হুমকির কঠোর জবাব দিয়েছে। দেশটি সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা হলে তারা পাল্টা জবাব দেবে।

ইরান ইন্টারন্যাশনাল লিখেছে, ইরানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রধানত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোর বেশির ভাগই প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে চলে।

তুলনামূলকভাবে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা অল্প এবং এগুলো কেবল তেহরান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসহ প্রধান শহুরে ও শিল্পকেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি হলো তেহরানের পূর্বে অবস্থিত দামাভান্দ কম্বাইন্ড-সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্রটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর মেট্রোপলিটন এলাকায় এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে কাস্পিয়ান উপকূলের নেকা ও ইস্পাহানের নিকটবর্তী

শহীদ মোন্তাজেরিসহ অন্য বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ভূমিকা পালন করে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্বাভাবিক হামলা হলেই তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে।

অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়ের শঙ্কা
ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা হলে পর্যায়ক্রমে পুরোদেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটতে পারে। হাসপাতালগুলো জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য স্থিতিশীল বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। পানি উত্তোলন এবং পরিশোধন কেন্দ্রগুলোর সরবরাহ বজায় রাখার জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন। পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, কারখানা এবং পরিবহন ব্যবস্থা সবই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎশক্তির ওপর নির্ভরশীল।

যুদ্ধে ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং খরার মতো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের কারণে চাপের মধ্যে দেশটির সরকার। বড় আকারের বিদ্যুৎ বিভ্রাট এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা কারখানা থেকে শুরু করে বাড়ির পানি সরবরাহ পর্যন্ত সবকিছুকে প্রভাবিত করবে।

যেহেতু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়, তাই ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত করতেও সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্য বিধিনিষেধের অধীনে তা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা বিপর্যয় বাড়াবে
ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো আক্রান্ত হলে তারা আনুপাতিকভাবে জবাব দেবে। প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সুস্পষ্ট লক্ষ্যবস্তু বানাবে তেহরান। পারস্য উপসাগরের তেল স্থাপনা, প্রধান শহরগুলোতে পানীয় জল সরবরাহকারী লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র এবং ইসরায়েলি অবকাঠামো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

তেহরান তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমেও প্রতিশোধ নিতে পারে। এর আগে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি উভয়েই অবকাঠামো ও নৌপথকে লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে ইরানের প্রক্সি শক্তির হামলা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরানের হামলা শুরু হলে সমগ্র অঞ্চলজুড়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা করা বেআইনি এবং এই ধ্বংসযজ্ঞ নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর হামলার ফলে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here