ঈদুল ফিতর বাঙালির জীবনে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এক পুনর্মিলনের উপলক্ষ। যা পরিবার, প্রকৃতি ও নিজস্ব সত্তার সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের সময়। রোজার একমাস সংযমের পর এই উৎসব যেন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার এক উজ্জ্বল ঘোষণা। আর সেই আনন্দকে পূর্ণতা দিতে ঢাকার আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা বিনোদন কেন্দ্র, রিসোর্ট, ঐতিহাসিক স্থান ও নান্দনিক পার্কগুলো হয়ে ওঠে মানুষের স্বস্তির আশ্রয়।
ঢাকার উত্তরে গাজীপুর অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৃতির সঙ্গে অবকাশ যাপনের জন্য অন্যতম নির্ভরযোগ্য গন্তব্য। শহরের কোলাহল থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে এখানে পাওয়া যায় গাছপালায় ঘেরা এক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ। এই অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত স্থানগুলোর একটি ‘নুহাশ পল্লী’। যা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সৃজনশীল ভাবনার প্রতিফলন। এখানে কৃত্রিমতা নেই, বরং রয়েছে গ্রামীণ বাংলার সরলতা ও নান্দনিকতা। একইভাবে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক’ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সাফারি পার্ক হিসেবে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। এখানে উন্মুক্ত পরিবেশে বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ, যা শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।
গাজীপুরেই আরও কিছু নান্দনিক রিসোর্ট রয়েছে, যেগুলো ঈদের ছুটিতে স্বল্প সময়ের বিলাসবহুল অবকাশের সুযোগ দেয়। ‘সারাহ রিসোর্ট’ তার সবুজ বাগান, সুইমিং পুল ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার জন্য পরিচিত। অন্যদিকে ‘ড্রিম স্কয়ার রিসোর্ট’ প্রকৃতি ও স্থাপত্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে, যেখানে পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে সময় কাটানোর জন্য রয়েছে নানা আয়োজন। এছাড়া ‘জল ও জঙ্গলের কাব্য’ একটি ভিন্নধর্মী অবকাশ কেন্দ্র। যেখানে জলাশয়, কাঠের স্থাপনা ও নীরবতা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক কাব্যিক পরিবেশ।
ঢাকার পূর্বদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত ‘জিন্দা পার্ক’ একটি অনন্য উদাহরণ, যেখানে স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একটি সুপরিকল্পিত সবুজ পার্ক। প্রায় শতাধিক প্রজাতির গাছ, পরিচ্ছন্ন লেক এবং সুশৃঙ্খল পথঘাট,সব মিলিয়ে এটি একটি পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র। ঈদের সময় এখানে মানুষের ভিড় থাকলেও, এর প্রাকৃতিক ভারসাম্য দর্শনার্থীদের মনকে প্রশান্ত করে।
ঐতিহ্য প্রেমীদের জন্য সোনারগাঁও অঞ্চলটি এক গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ‘পানাম সিটি’ মধ্যযুগীয় বাংলার বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এটি একটি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, যেখানে সারি সারি প্রাচীন ভবন অতীতের গল্প বলে। এর পাশেই অবস্থিত ‘ বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর’। যেখানে বাংলার লোকজ শিল্প, কারুশিল্প ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত রয়েছে। ঈদের ছুটিতে এখানে ভ্রমণ শিক্ষামূলক ও আনন্দদায়ক দুটোই।
ঢাকার পশ্চিমে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়াতে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি পর্যটকদের জন্য অন্যতম নিদর্শন। এখানে ইতিহাসে ঘেরা স্মৃতিময় বিশাল দালান ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও কিছু মনোরম রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, যা নদী ও গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যদিও এই অঞ্চলের অনেক রিসোর্ট ব্যক্তিগত বা নির্দিষ্ট বুকিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবুও প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা এখানে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
অন্যদিকে, যারা দূরে যেতে চান না, তাদের জন্য ঢাকার ভেতরেও রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন কেন্দ্র। ‘রমনা পার্ক’ দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসীর প্রাতঃভ্রমণ ও অবকাশের স্থান হিসেবে পরিচিত। ঈদের সকালে এখানে এক ধরনের শান্ত আবহ বিরাজ করে। একইভাবে ‘হাতিরঝিল’ আধুনিক নগর উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত, যেখানে জলাধার, সেতু ও আলোকসজ্জা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি আকর্ষণীয় পরিবেশ। সন্ধ্যায় এখানে মানুষের সমাগম উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। এর বাইরে বর্তমানে ‘বিচারপতি শাহাবুদ্দিন পার্ক’ তরুণদের নানা আয়োজন ও সমাগমের অন্যতম স্থান হয়ে উঠেছে।
রসনাবিলাসের ক্ষেত্রেও ঢাকার বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য। ঈদ তাতে যেন নতুন মাত্রা যোগ করে। পুরান ঢাকার ‘হাজীর বিরিয়ানি’ বহু দশক ধরে তার স্বাদ ও ঐতিহ্যের জন্য জনপ্রিয়।
অন্যদিকে, আধুনিক পরিবেশে আন্তর্জাতিক মানের খাবার ও নান্দনিক পরিবেশের জন্য ঈদের সময় তরুণ প্রজন্মের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত ধানমন্ডি, বনানী ও গুলশানের বিভিন্ন রেস্তোরা। এর মধ্যে বনানীর ‘যাত্রা বিরতি’, ‘টাগোর টেরেস’, ‘ টেরাকোটা টেইলস’, অন্যতম।




