আমাদের ব্যস্ত জীবন ও চাপের মধ্যে নিজের লক্ষ্য অর্জন করা অনেক সময় কঠিন মনে হয়। যখন এই লক্ষ্যগুলো জীবনের মান উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তখন এগুলো পূরণে বাধা আত্মসম্মানকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। মস্তিষ্ক এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে; এটি কখনও সহায়ক হয়, আবার কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে স্নায়ুবিজ্ঞান থেকে প্রাপ্ত কিছু জ্ঞানের সাহায্যে মস্তিষ্কের শক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করে জীবন ও লক্ষ্যকে সমর্থন করা সম্ভব।
১. মস্তিষ্ককে নিজের পক্ষে কাজ করতে শেখানো
মস্তিষ্ক স্থির কোনো অঙ্গ নয়। এটি অত্যন্ত অভিযোজনযোগ্য ও নমনীয়। এই ক্ষমতাকে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি। নিউরোপ্লাস্টিসিটি হলো মস্তিষ্কের সেই ক্ষমতা যার মাধ্যমে এটি নিজেকে পুনর্বিন্যস্ত করতে পারে, নতুন স্নায়বিক সংযোগ গড়ে তুলতে পারে এবং অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার প্রভাবে তার গঠন ও কার্যকারিতা পরিবর্তন করতে পারে।
মস্তিষ্ক জীবনের সবসময় বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এটি নতুন সংযোগ তৈরি করতে পারে, বিদ্যমানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে এবং প্রয়োজনে পুনঃসংযোজন করতে পারে। অর্থাৎ, নিজের লক্ষ্য সমর্থন করতে মস্তিষ্ককে আমরা রূপ দিতে পারি।
এর জন্য পুনরাবৃত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। যত বেশি কোনো আচরণ বা মানসিক কর্মকাণ্ড পুনরাবৃত্তি করা হবে, সেই আচরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়বিক সংযোগ তত শক্তিশালী হবে। এটি হলো সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি। লক্ষ্যভিত্তিক আচরণ ও চিন্তার ধারা ধারাবাহিকভাবে চর্চা করলে মস্তিষ্কে এই পথগুলো আরও কার্যকর ও স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠে।
নতুন অভ্যাস গড়ার জন্য টিনি হ্যাবিটস মেথড অনুসরণ করা যেতে পারে, যেখানে মূল তিনটি উপাদান হলো ট্রিগার, মোটিভেশন এবং প্রয়োজনীয় আচরণ। যেমন, দাঁত ব্রাশ করার পর ১৫ মিনিটের হাঁটাহাঁটি শুরু করা। ছোট ছোট অভ্যাসকে পুনরাবৃত্তি করে একটি রুটিন তৈরি করা যায় যা লক্ষ্য অর্জনের পথে সহায়ক হয়।
২. বৃদ্ধির মানসিকতা (Growth Mindset) গড়ে তোলা
মানসিকতা চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। বৃদ্ধির মানসিকতা হলো বিশ্বাস যে দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে উন্নত করা যায়। এটি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, ব্যর্থতার মুখে অধ্যবসায় এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও শিখতে সাহায্য করে।
গবেষণা দেখিয়েছে, বৃদ্ধির মানসিকতা থাকা মানুষ চ্যালেঞ্জ নিতে বেশি সচেষ্ট এবং বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম। ব্যর্থতাকে তারা শেখার সুযোগ হিসেবে দেখে। এটি অর্জনের জন্য সীমাবদ্ধ বিশ্বাস চিহ্নিত করা এবং তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন অভ্যাস, ইতিবাচক কন্টেন্ট দেখা বা নতুন জায়গায় যাওয়া মস্তিষ্ককে নতুন তথ্য গ্রহণের জন্য উদ্দীপিত করে, যা ডোপামিনের মুক্তির মাধ্যমে আরও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
৩. মানসিক শান্তি রক্ষা করা
মস্তিষ্কের সক্ষমতা সরাসরি মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘস্থায়ী চাপ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং লক্ষ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি করে। কোর্টিসল হরমোনের উচ্চ মাত্রা স্মৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মনোসংযোগকে প্রভাবিত করে।
সুস্থ জীবনধারা, ব্যালান্সড ডায়েট, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের জন্য অপরিহার্য। দৈনন্দিন অভ্যাসের মাধ্যমে যেমন ব্যায়াম, ধ্যান, কৃতজ্ঞতা চর্চা ও হবি মেনে চলা মস্তিষ্ককে সহায়ক করে।
নিউরোপ্লাস্টিসিটি, বৃদ্ধির মানসিকতা এবং মানসিক সুস্থতার উপর নজর রেখে মস্তিষ্কের ক্ষমতা সর্বাধিক ব্যবহার করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক চর্চা এবং মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী বোঝার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা অনেক সহজ হয়ে যায়। মস্তিষ্ককে নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী সহায়ক বানিয়ে লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহার করা সম্ভব।




