‘কৃষক কার্ডে’ মিলবে ভর্তুকি, ঋণ, সেচসহ ১০ সুবিধা

0
7

দেশের কৃষি খাতকে ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। তিন ধাপে পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সব কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হবে ‘কৃষক কার্ড’। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ভর্তুকি, কৃষিঋণ, সেচ সুবিধা, কৃষি উপকরণসহ অন্তত ১০ ধরনের সেবা পাবেন। পাশাপাশি তৈরি হবে একটি সমন্বিত কৃষক ডেটাবেজ, যা ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার।

এ ছাড়া প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। মোট ২২ হাজার ৬৫ জন তালিকাভুক্ত কৃষকের মধ্যে ২০ হাজার ৬৭১ জন এই সহায়তা পাবেন। সরকার বলছে, এটি সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মতো কাজ করবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কৃষকদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে। এই অর্থ শুধু কৃষি কাজে ব্যয় করা যাবে এবং এতে অন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পেতে কোনো সমস্যা হবে না।

আগামীকাল পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন।

তিন ধাপের রোডম্যাপ

কৃষিমন্ত্রী জানান, ‘কৃষক কার্ড’ প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে– প্রাক-পাইলটিং, পাইলটিং এবং দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। প্রথম ধাপে প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম চালু হচ্ছে ১০ জেলার ১১টি উপজেলায়, ১১টি কৃষি ব্লকে। এই পর্যায়ে সীমিত আকারে প্রকল্পটি চালিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া হবে। এখানে শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকই নন, বরং মৎস্যচাষি, আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খামারি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ কৃষিকে একটি সমন্বিত খাত হিসেবে বিবেচনা করে কার্ড ব্যবস্থাটি তৈরি করা হচ্ছে। প্রাক-পাইলটিং শেষে আগামী আগস্ট পর্যন্ত ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম চালু করা হবে। এরপর পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করে পর্যায়ক্রমে চার বছরের মধ্যে সারাদেশে এই কার্ড বিতরণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষক তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রথম ধাপে ২২ হাজার কৃষক

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ইতোমধ্যে ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই তালিকায় ভূমির পরিমাণ অনুযায়ী পাঁচটি শ্রেণিতে কৃষকদের ভাগ করা হয়েছে। ভূমিহীন কৃষক (৫ শতকের কম জমির মালিক) আছেন দুই হাজার ২৪৬ জন। প্রান্তিক কৃষক (৫ থেকে ৪৯ শতক) ৯ হাজার ৪৫৮ জন। ক্ষুদ্র কৃষক (৫০ থেকে ২৪৯ শতক) আট হাজার ৯৬৭ জন। মাঝারি কৃষক (২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক) এক হাজার ৩০৩ জন এবং বড় কৃষক (৭৫০
শতকের বেশি জমির মালিক) মাত্র ৯১ জন। পেশাভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, মোট তালিকাভুক্তদের মধ্যে ২১ হাজার ১৪১ জনই ফসল উৎপাদনকারী কৃষক। এ ছাড়া ৮৫৫ জন প্রাণিসম্পদ খামারি, ৬৬ জন মৎস্যজীবী এবং অল্পসংখ্যক লবণচাষি অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

নগদ সহায়তা, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রান্তিকদের

এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এই তিন শ্রেণির মোট কৃষকের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন, যা মোট তালিকাভুক্ত কৃষকের বড় অংশ।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই নগদ সহায়তা একটি সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মতো কাজ করবে, যা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কৃষকদের উৎপাদন চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। তবে মাঝারি ও বড় কৃষকরা এই নগদ সহায়তার আওতায় থাকবেন না, যদিও অন্যান্য সুবিধা তারা পাবেন।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মতো, যে কৃষকদের নগদ সহায়তা দেওয়া হবে তারা সে অর্থ শুধু কৃষিকাজে খরচ করতে পারবেন। এই সহায়তার কারণে অন্য সামাজিক সুরক্ষার সহায়তা পেতে অসুবিধা হবে না।

এক কার্ডে ১০ সুবিধা

কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা যেসব সুবিধা পাবেন, তা কৃষি খাতকে সমন্বিত সেবা ব্যবস্থায় নিয়ে যাবে। কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে সার-বীজসহ কৃষি উপকরণ পাবেন। সেচ সুবিধা নিতে পারবেন ভর্তুকি মূল্যে। সহজ শর্তে কৃষিঋণ পাওয়া যাবে, যা উৎপাদন ব্যয় মেটাতে সহায়ক হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি স্বল্পমূল্যে পাওয়া যাবে, যা আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারে ভূমিকা রাখবে। সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি এই কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া হবে। মোবাইল ফোনে আবহাওয়া পূর্বাভাস ও বাজারদর সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছে যাবে কৃষকের হাতে। কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমনের পরামর্শ এবং কৃষি বীমা সুবিধাও এই কার্ডের আওতায় থাকবে।

প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় আট কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে কার্ড ইস্যু, তথ্য সংগ্রহ, ব্যাংকিং সংযোগ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথম ধাপে পঞ্চগড়, বগুড়া, ঝিনাইদহ, পিরোজপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মৌলভীবাজার ও জামালপুর জেলার নির্দিষ্ট ব্লকে এই কার্যক্রম চালু হচ্ছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তি

‘কৃষক কার্ড’ মূলত একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড, যা সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন।

স্থানীয় ডিলারের কাছে থাকা পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন ব্যবহার করে সার, বীজ, প্রাণিখাদ্য, মৎস্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমবে এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here