শীতের সকালের নরম রোদে তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলো এখন সবুজে মোড়া। একসময় যেখানে ছিল শুধু বালু, ধুলা আর অনিশ্চয়তা। আজ সেখানে কৃষকের ঝড়া ঘামে জন্ম নিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল এখন জীবনসংগ্রাম, ঘুরে দাঁড়ানো আর স্বপ্ন ফেরার গল্প শোনাচ্ছে।
বর্ষা মৌসুম শেষে তিস্তার পানি নামতে শুরু করলেই ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে বিস্তীর্ণ চর। প্রথম দিকে এসব চর কেবল বালুময় প্রান্তর হিসেবেই চোখে পড়ে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে শুরু হয় মানুষের পদচারণা। স্থানীয় কৃষকেরা বাঁশের লাঠি হাতে জমির সীমানা মাপেন, বালুর ওপর টেনে নেন নতুন জীবনের রেখা। এরপর শুরু হয় চাষাবাদের প্রস্তুতি—কখনো দলবেঁধে জমি পরিষ্কার, কখনো বীজতলা তৈরি, আবার কোথাও সেচের নালা তৈরি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চরজুড়ে চোখে পড়ে ভুট্টার হলুদাভ শিষ, সবুজ মরিচগাছ, কুমড়ার লতানো ডগা আর নানা জাতের শাকসবজি। কোথাও বাদাম, কোথাও আউশ ধানের চারা। উর্বর বালুমাটি ও খোলা পরিবেশে এসব ফসল দ্রুত বেড়ে উঠছে। সকালে চরজুড়ে দেখা যায় কৃষকদের ব্যস্ততা—কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউবা ফসল তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
হিমালয়ের কোলে জন্ম নেওয়া তিস্তা নদী শুধু একটি জলধারা নয়। এটি উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা। ভারতের সিকিম রাজ্যের হিমবাহ অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়ে তিস্তা নেমে আসে দার্জিলিং পাহাড় পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার কাছে। এরপর রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ ছুঁয়ে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে নদীটি। কয়েক শতাব্দী ধরেই তিস্তা বারবার গতিপথ বদলেছে–কখনো উর্বর পলি রেখে গেছে মাঠে–ঘাটে, আবার কখনো কেড়ে নিয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। স্বাধীনতার পর ডালিয়া ব্যারাজকে কেন্দ্র করে সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পানিবণ্টন ও নদীশাসনের সীমাবদ্ধতায় চরাঞ্চলের মানুষ আজও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তবুও প্রতি বছর বর্ষা শেষে তিস্তার বুকে জেগে ওঠা নতুন চর কৃষকদের সামনে খুলে দেয় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের শংকরদহ চরের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, নদীভাঙনে একসময় সব হারিয়ে ফেলেছিলাম। ঘরবাড়ি, জমিজমা—সবই গেছে তিস্তার গর্ভে। এখন এই চরে চাষ করে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। ফসল বিক্রি করে সংসার চলছে, ছেলেমেয়ের পড়াশোনাও চালাতে পারছি। তার মতো অনেক কৃষকই নদীভাঙনের পর বারবার আশ্রয় বদলেছেন। তবুও থেমে থাকেননি। বালুচরই হয়ে উঠেছে তাদের নতুন ঠিকানা, নতুন স্বপ্নের মাঠ।
তবে এই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ঝুঁকি। চরাঞ্চল স্থায়ী নয়। উজান থেকে নেমে আসা হঠাৎ ঢল কিংবা অকাল বন্যায় এক রাতেই তলিয়ে যেতে পারে মাসের পর মাসের পরিশ্রম। তাই চাষাবাদের পাশাপাশি কৃষকদের মনে কাজ করে অনিশ্চয়তার শঙ্কা। অনেকেই বলেন, ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত স্বস্তি নেই। তবু জীবন থেমে থাকে না। ঝুঁকি নিয়েই তারা এগিয়ে চলেছেন।
চর অঞ্চলের কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। ফসল তোলা, শাকসবজি পরিচর্যা থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত নানা কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন তারা। এতে একদিকে পরিবারের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে নারীদের সামাজিক অবস্থানেও আসছে পরিবর্তন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নতুন চরে প্রায় ৫০ হেক্টর এবং পুরোনো চরে প্রায় ২ হাজার ৯১০ হেক্টর জমি এখন আবাদযোগ্য হয়ে উঠেছে। বালুমিশ্রিত দোআঁশ মাটিতে ভালো ফলন পাওয়ায় কৃষকেরা এখানে ধান, ভুট্টা, সরিষা, তরমুজ, আলু, চিনাবাদাম, মরিচ, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, পেঁয়াজ, রসুন, শিম, গম, শসা ও তামাকসহ নানা ধরনের ফসল চাষ করছেন।
কৃষি বিভাগ বলছে, পরিকল্পিতভাবে আধুনিক চাষপদ্ধতি, উন্নত বীজ ও সেচসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে চরাঞ্চলের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এবছর ১২০ হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ হয়েছে। যা এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে তিস্তার চরে তরমুজ, খেসারি, চীনাবাদাম ও তুলার মতো অর্থকরী ফসল সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও এখানে মূলা, ক্ষীরা ও লাউয়ের বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ রুবেল হুসেন জনকণ্ঠকে জানান, চরাঞ্চলের কৃষকদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কোন জমিতে কোন ফসল উপযোগী, কখন বপন করতে হবে এবং কীভাবে সেচ–সার ব্যবস্থাপনা করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়-এসব বিষয়ে কৃষকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তার মতে, পরিকল্পিত চাষাবাদ ও সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে তিস্তার চরাঞ্চল ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উৎপাদন এলাকায় পরিণত হতে পারে।
তিস্তার জেগে ওঠা চর শুধু বালুর স্তূপ নয়। এটি মানুষের লড়াই, ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি আর আশার প্রতিচ্ছবি। সবুজে মোড়া এই চরগুলো যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেও মানুষ স্বপ্ন বুনতে জানে।




