শ্রেণি বিভক্ত সমাজে প্রথম এবং চিরস্থায়ী যে বিভাজন সময় আর সভ্যতাকে নাড়া দিয়েছে তা হলো নারী-পুরুষ বিভেদ পার্থক্য। যা একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মধ্যাহ্নে ও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া শব্দটি যৌক্তিক না হলেও কঠিন রূঢ় এক সত্যবচন। যা আজও ঘোচানো গেলই না। তথ্য প্রযুক্তির নব বিশ্বায়নে তা আরও অসহনীয় এক দুর্বিসহ বাতাবরণ। শ্রম শক্তি যে কোন সমাজ সংস্কারের অবধারিত নির্ণায়ক যা শুধু পরিবেশ পরিস্থিতির নির্ধারকই নয় বরং অভাবনীয় এক শীক্ত ময়তার চূড়ান্ত নির্দেশক। আর যে কোনো সমাজের অর্থনীতি পুরো ব্যবস্থার নির্ণায়কই নয় বরং চারিকা শক্তির বিচারেও অগ্রগণ্য।
স্বৈরাচার পতনের পর নতুন ও বদলে যাওয়া আধুনিক বাংলাদেশ পুনরায় নতুন অবয়বে তৈরি করতে গেলে হরেক বৈষম্য বিভাজন চিহ্নিত করাও জরুরি। আর শ্রম বাজারে অর্ধাংশ নারীর সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়া পরিবর্তিত পরিবেশকে আরও বেশি করে ন্যায্যতা দেওয়া। তবে ইদানীং নারীর শ্রম বাজারে দৃশ্যমান অগ্রগতিতে পিছু হটা কোনোভাবেই মান্যতা পায় না। সমসংখ্যকের যে কোনো একটি অংশ যদি তার অধিকার, ন্যায্যতা কিংবা এগিয়ে যাওয়ার পথে পিছিয়ে যায় তাহলে সার্বিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি অধরা থেকেই যাবে। আর অর্থনীতিতে তো অনেকখানিই। তাছাড়া দশভুজা নারীরা একদিকে সংসার চালান অন্যদিকে কর্মজীবন ও নির্বিঘেœ সম্পন্ন করা সমতার আদলে সবাই এগিয়ে চলার পরম বার্তা তো বটেই। যদিও নারীদের গৃহশ্রমকে কখনোই ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না। বরং বিধাতার সৃষ্টিযজ্ঞের অন্যতম কর্মযোগ হিসেবেই ধরা হয়।
সম্প্রতি অর্থনীতি ও ইডেন মহিলা কলেজের এক আলোচনা সভায় নতুন এমন সব সার্বজনীন চিরস্থায়ী তথ্য সত্য উঠে আসছে। শুধু বর্তমানে বিভিন্ন শ্রম শক্তিতে উদ্বেগজনক হারে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়াও সংশ্লিষ্টদের জন্য কোনো শুভ সংকেতই নয়। বরং অবধারিত চিরস্থায়ী দুর্ভোগের সময়ের গতিতে আরো বেহাল অবস্থাকেই প্রতীয়মান করছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও ইডেন মহিলা কলেজের যৌথ উদ্যোগে এক আলোচনা সভায় এই আশঙ্কা উঠে আসে। নারীর ক্ষমতায়ন নতুন কিছু নয়Ñ যা যুগ যুগান্তরের পরম নির্মাল্য। সেই সৃষ্টি আদিকাল থেকেই সমাজ সংস্কারের কৃষি সভ্যতার বিকাশও নারীর হাতেই তৈরি হয়েছে বলে নৃ ও সমাজ বিজ্ঞানীদের বদ্ধমূল ধারণা। এমনকি পৃথিবীতে যে আদি ও অকৃত্রিম সংগঠন পরিবার তাও মাতৃতান্ত্রিক বলে আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী লুইস হেনরি মর্গান তাঁর আদিম সমাজ বইটিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গবেষণা চালিয়ে এমন চিরস্থায়ী বরমাল্য দুনিয়াকে উপহার দেন। শুধু কি তাই? পরিবার হিসেবেও মাতৃতান্ত্রিকই সবার আগে প্রতিষ্ঠা পায়। অবাধ স্বেচ্ছার আর দলগত বিয়েতে পিতার পরিচয় ছিল এক অজানা বিস্ময়। মায়ের জঠর থেকে সন্তান আসতো বলে মাকেই চেনা গেছে।
আর নব্য দুনিয়ার তথ্যপ্রযুক্তির অলংকরণে তেমন নারী শক্তি আজও তার নীরব শ্রম, অদৃশ্য কর্মনিষ্ঠায় সমাজ সভ্যতাকে নতুন মাত্রা দিয়ে যাচ্ছে। মূল্য অমূল্য আর এক হিসেবে নিকেশের বিষয়। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট প্রতিনিয়তই যা প্রমাণ করেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ত্রৈমাসিক শ্রম শক্তি জরিপে বিভিন্ন অসঙ্গতি স্পষ্টতই সামনে চলে আসে বাংলাদেশ এখনো সিংহভাগ পল্লী জননীর নিভৃত ছায়ায় কাল যাপনের এক অনন্য অধ্যায়, সময় বললেও বেশি নয়, কিন্তু। তাই শ্রম শক্তিতে নারীর অংশ কমে যাওয়ার সচিত্র প্রতিবেদন উঠে আসছে প্রান্তিক অঞ্চলও নারীদের ওপর গবেষণায়।
অতি প্রাসঙ্গিকভাবেই বিঘœতার জাল কেন এখনো সচল ক্রিয়াশীল তা অনুধাবনে পিতৃতান্ত্রিকতকেই দায়ী করা হচ্ছে। তবে তা আংশিক সত্য হলেও পুরোপুরি নয়। কারণ বিভিন্ন সময় নারীরা নিজেও অনেক কিছু থেকে আপন ইচ্ছেয় পিছিয়ে থাকেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় যান্ত্রিক কলা কৌশলে সমসংখ্যক পিছনে পড়ে থাকা সবটা অদক্ষ আর অক্ষমতার কারণে নয়। এমনকি পুরুষের জন্য নয়। বরং নারীরা স্বভাবগত কারণে নব্যপ্রযুক্তিও আধুনিকতার অনেক নতুন সময় থেকে পেছনে থাকেন, গ্রহণ করার মানসিকতা জগতেও সময় ক্ষেপণ করতে হয়। তবে বর্তমানে তা অনেকাংশে দূরীভূত হলেও আঁধার এখনো কাটেইনি।
তা না হলে এমন তথ্য সত্য কেন বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসবে? প্রশ্ন থেকেই যায়। সমতা নির্ভর শ্রম বাজার তৈরি যেমন যৌক্তিকও প্রাসঙ্গিক পাশাপাশি গ্রহণ করার মানসিকতা, মূল্যবোধও অত্যাবশ্যক। সেখানেও জোর দেয়া সময়ের অপরিহার্যতা। গ্রামীণ নারীদের উঠোন বৈঠকে মধ্যে ফোন আর যন্ত্রের প্রতি মানসিকতাই শুধু নয় গ্রহণ করার অপরিহার্যতা ও দৃশ্যমান হচ্ছে। যা যন্ত্রসভ্যতায় দেশের সবাইকে এগিয়ে নিতে শুভ পদক্ষেপ বলাই যায়। নতুন যে কোন সৃষ্টি, ভাব সম্পদ মেনে নিতে সমসংখ্যক নারী বরাবরই পেছনে ছিল। আধুনিকতার বরমাল্যে তা কমে আসলেও বাধা বিপত্তি শেকড়ের গভীরে প্রচ্ছন্নভাবে জিইয়ে আছে।
সঙ্গত কারণে নতুন পুরাতনের দ্বন্দ্বে সব সময় নারীরাই পিছিয়ে থাকে। বর্তমানে তা কমে আসলেও একেবারে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়ইনি। বিশিষ্টজনের অভিমত দিচ্ছেন-নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু শ্রমবাজারে তাদের মূল শক্তি বিনিয়োগ হতে দেরি হলে সমস্যা গোটা অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলার আশঙ্কা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশ অর্থনীতি সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চিহ্নিত করলেন যে শ্রমশক্তি সমাজ সভ্যতার ধারক সেখানে সমান সংখ্যকের এক অংশও যদি পিছিয়ে থাকে তাহলে উন্নয়ন, গতিশীলতা আসতে আরও বিলম্ব হতে সময় নেবে না। আর অর্থনীতি উন্নতিশীলতাও সুদূরপরাহত হবে।
অপরাজিতা প্রতিবেদক




