হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই দেশে এবার যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) এসে যক্ষ্মা রোগী শনাক্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শনাক্তের হার কম হওয়ার অর্থ বিস্তারের ঝুঁকি বেড়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে এরই মধ্যে ওষুধ ও কিটের মজুত শেষ হয়েছে। নতুন কেনাকাটাতেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যক্ষ্মা বিস্তারের শঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত মাসে করা স্বাস্থ্য বুলেটিনের তথ্য বলছে, সরকারের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনটিপি) ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে জাতীয় কেস নোটিফিকেশন রেট (সিএনআর) নেমে এসেছে ১৬৯-এ, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২৪ সালের একই সময়ে এ হার ছিল ১৯৬ এবং ২০২৩ সালে ২০১। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শনাক্তকরণ কমে যাওয়া মানে রোগ কমে যাওয়া নয়; বরং এটি সেবা ও নজরদারিতে ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১২১ জনের যক্ষ্মা হয়।
অর্থায়ন ও জনবল সংকটের প্রভাব
স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (সেক্টর কর্মসূচি নামে পরিচিত) অধীন অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) আওতায় প্রায় তিন দশক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়। গত বছর নতুন করে ডিপিপি জমা দিলেও অনুমোদন হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় বন্ধ রয়েছে ওষুধ ও টিকার কেনাকাটা। এতে মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে মার্কিন সহায়তা সংস্থা ইউএসএইড ও গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেছে। এককভাবে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে নতুন করে কোনো অর্থায়ন করবে না এই দুটি প্রতিষ্ঠান। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত জুনে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) করা হয়, যা এখনও অনুমোদন হয়নি।
গত সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটিতে কিছু সংশোধনী দিয়ে ফের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত অর্থায়ন ও প্রশাসনিক অনুমোদন না হলে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানান, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হতো রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ও বৈদেশিক ফান্ডে। ২০২৪ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে জটিলতা এবং বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার পাশাপাশি জনবল ঘাটতির কারণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ফলে রোগী শনাক্তকরণেও ভাটা পড়েছে। এর ফলে উচ্চ হারে যক্ষ্মা ছড়াবে।
বিভাগভিত্তিক একই চিত্র
সব বিভাগেই রোগী শনাক্তের হার কমেছে। রংপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে যেখানে প্রতি লাখে শনাক্ত ছিল ২০০ জন, চতুর্থ প্রান্তিকে তা নেমে এসেছে ১৪৯-এ। অন্যদিকে সিলেট বিভাগ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও সেখানেও হার কমেছে— তৃতীয় প্রান্তিকে ২১৫ থেকে চতুর্থ প্রান্তিকে ২০১ জনে নেমে এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশে প্রতি লাখে প্রায় ১২১ জন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। বছরে এ রোগে আক্রান্ত হয় প্রায় তিন লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। প্রতিদিন গড়ে শনাক্ত হয় এক হাজার ৩৪ জন রোগী এবং বছরে প্রায় ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় অর্থাৎ প্রতিদিন মারা যায় প্রায় ১২১ জন।
বুলেটিনে বলা হয়েছে, শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৬০ শতাংশই ফুসফুসের যক্ষ্মায় আক্রান্ত। ব্যাকটেরিয়াল পরীক্ষায় তা নিশ্চিত। এ ছাড়া ২৫ শতাংশ ফুসফুসের বাইরে এবং ১৫ শতাংশ রোগী ক্লিনিক্যালি নির্ণীত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র শিশুদের ক্ষেত্রে। সাধারণত দেশে মোট যক্ষ্মা রোগীর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু থাকে। কিন্তু এখন শনাক্ত হচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে শিশু রোগী শনাক্ত সংখ্যা নেমে এসেছে দুই হাজার ৯৯৫-এ। অথচ ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল চার হাজার ৩৩১ এবং ২০২৩ সালে চার হাজার ৩২৮। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পতন প্রকৃতপক্ষে রোগ কমার ইঙ্গিত নয়; বরং শনাক্তকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর নভেম্বরে গ্লোবাল ফান্ডের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে কর্মসূচির অগ্রগতি মূল্যায়ন করে। তাদের পর্যবেক্ষণে সেবা প্রদানে ঘাটতি, তথ্যের মানোন্নয়নের প্রয়োজন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা উঠে আসে। সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এখনও প্রায় ২১ শতাংশ রোগী শনাক্তের বাইরে রয়ে গেছে। বিশ্বের যে ৩০টি দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ দ্রুত শনাক্ত করা, পূর্ণ মেয়াদে চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং শিশু রোগী শনাক্তে বিশেষ জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের সাফল্যের পর যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এখন নতুন করে চাপে পড়েছে। পরিকল্পনা ছাড়া কার্যক্রমে পরিবর্তন, অর্থায়ন সংকট এবং পরীক্ষাগার কার্যক্রমে স্থবিরতার কারণে রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধ ব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সংগঠন সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ ফোরামের সভাপতি কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর বলেন, শনাক্ত কমে যাওয়া মানে রোগ কমে যাওয়া নয়, এটি সেবা ও নজরদারিতে ঘাটতি। গত ৫০ বছরে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে দেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল। তবে হঠাৎ করে পরিকল্পনা ছাড়াই ‘অপারেশন প্ল্যান’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসূচিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ইউএসএইড ও গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রভাব সরাসরি যক্ষ্মা কর্মসূচিতে পড়েছে।
তাঁর ভাষ্য, অনেক জেলায় জিন এক্সপার্ট ল্যাব বন্ধ রয়েছে। কিছু ল্যাব সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও অর্থের অভাবে সেগুলোও চালু করা যাচ্ছে না। ফলে আবারও ভুল রোগী শনাক্তের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে কাজী সাইফউদ্দীন বলেন, সক্রিয়ভাবে রোগী খোঁজা বাড়াতে হবে এবং কমিউনিটি পর্যায়ে স্ক্রিনিং জোরদার করতে হবে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যক্ষ্মা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এমনকি হামের চেয়েও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠপর্যায়ে স্ক্রিনিং কার্যক্রম কমে যাওয়া, রিপোর্টিংয়ে ঘাটতি, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে জনসাধারণের নানা প্রতিবন্ধকতা— এসব কারণে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির যক্ষ্মা বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে স্বাস্থ্য খাত। সরকারি অর্থায়নের যে জটিলতা জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে চলছে, আশা করা যায় তা দ্রুতই সমাধান হবে। বর্তমান সরকার রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিয়ে এ জাতীয় বাজেটে অর্থায়ন বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা যক্ষ্মা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে অবদান রাখবে।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির উপপরিচালক ডা. শাফিন জাব্বার বলেন, শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) এসে শনাক্তকরণ হার কমছে কেন– এ বিষয়ে জানতে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। হঠাৎ করে এমন প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়া যাবে না। এটা নিয়ে বড় গবেষণা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সমকালকে বলেন, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে গতি ফেরাতে দ্রুত ডিপিপি অনুমোদন করার চেষ্টা করছি। ওষুধ কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আশা করি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে।




