আজ ২৪ মার্চ। একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের এই দিনটিতেও স্বাধীনতার দাবিতে গোটা দেশের পথে পথে মানুষের স্রোত নামে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সব সরকারি অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়। সারাদেশের ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলা ও শোকের কালো পতাকা উড়েছে।
অন্য দিনগুলোর মতো রাজধানী ঢাকা এদিনও রূপ নেয় মিছিলের নগরীতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় হয় মিছিল। দুপুরের আগেই জনারণ্যে পরিণত হয় নগরী। ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রের কর্মীদের সঙ্গে পাহারারত সৈন্যদের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে সন্ধ্যা থেকে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি হিসেবে অনুষ্ঠিত হয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কুচকাওয়াজ।
অদম্য বাঙালিকে প্রতিহত করতে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পথে নামে পাকিস্তানি সেনারা। ঢাকার মিরপুর, রংপুর, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে পাকসেনাদের ছত্রছায়ায় অবাঙালি বিহারীরা সাধারণ বাঙালির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুরে সামরিক সরকারের এজেন্টরা বোমাবাজি করে। চট্টগ্রাম ও রংপুরে জনতা-সেনাবাহিনী সংঘর্ষ হয়।
ঢাকার মিরপুরে অবাঙালিরা সাদা পোশাকধারী সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বাঙালির বাড়িঘর থেকে জোরপূর্বক স্বাধীন বাংলার পতাকা নামিয়ে অগ্নিসংযোগ ও পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন করে। রাতে বিহারীরা এখানে বোমাবাজির মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টির পাশাপাশি কিছু বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে আহত হন অনেকেই।
সৈয়দপুরে নিরীহ জনগণের ওপর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে শতাধিক মুক্তিকামী মানুষ শহীদ ও কয়েক হাজার আহত হন। সেখানকার সেনানিবাস সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রাম ঘেরাও করে এই গণহত্যা চালানো হয়। শহরে কারফিউ দিয়ে সেনাবাহিনী-অবাঙালি সম্মিলিতভাবে মানুষের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। রংপুর হাসপাতালের সামনে জনতা-সেনাবাহিনীর সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে সেনানিবাস এলাকায় সেনারা নিরস্ত্র মানুষের ওপর বেপরোয়া গুলি চালালে প্রায় অর্ধশত শহীদ ও বহু আহত হন।
হঠাৎ করেই বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত জনতার সঙ্গে পাকসেনাদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ঢাকায় দিনভর চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। বিক্ষুব্ধ মানুষের মিছিলের ঢল নামে ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। এসব মিছিল থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের আনুষ্ঠানিক ডাকের দাবি আসে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনের সামনে আগত মিছিলের উদ্দেশ্যে অসংখ্যবার বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা আদায়ে যে কোনো পরিণতির জন্য জনসাধারণকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। সরকারের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘বাংলার জনগণের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে তা বরদাশত করা হবে না।’
চট্টগ্রাম, রংপুর, সৈয়দপুর ও মিরপুরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গভীর রাতে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।’ এর আগে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতারা আরেক বিবৃতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে সশস্ত্র গণবিপ্লব আরও জোরদার করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
এদিন পাকিস্তানি সেনারা চট্টগ্রাম নৌবন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে নোঙর করা এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাস করতে গেলে বীর চট্টলার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ তাদের ঘিরে ফেলে। বিকেলে সেনাবাহিনী অস্ত্র খালাসের জন্য বন্দর শ্রমিকদের নিয়োগ করতে চাইলে তারাও অস্বীকৃতি জানান। পরে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ছাত্র-শ্রমিক-জনতা বন্দরের জেটি থেকে কদমতলী পর্যন্ত প্রায় চার মাইল পথের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দেয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রের মুখে খালাস করা কিছু অস্ত্র ১২টি ট্রাকে করে নতুনপাড়া আনার চেষ্টা করলে ডবলমুরিং রোডে ব্যারিকেড দিয়ে ট্রাকের পথরোধ করে দাঁড়ায় জনতা। রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকার পর জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে পাকসেনারা। লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ করে জনতাও। রাতভর এই সংঘর্ষে সেনা সদস্যদের গুলিতে শহীদ হন দুইশত শ্রমিক-জনতা।
সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট হাউসে আওয়ামী লীগ ও পাকিস্তান সরকারের উপদেষ্টা পর্যায়ে দু’ঘণ্টা বৈঠক হয়। বৈঠকে আওয়ামী লীগ থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন অংশ নেন। বৈঠক শেষে তারা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বক্তব্য শেষ হয়েছে। এখন প্রেসিডেন্টের উচিত তার ঘোষণা দেওয়া। প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করতে প্রস্তুত নয়।’
পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা বিকেলে পিআইএ’র একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন। করাচি রওয়ানা হওয়ার আগে ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান ও গাউস বক্স বেজেঞ্জো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন। পিপলস পার্টি প্রধান জুলিফিকার আলী ভূট্টো দুপুরে প্রেসিডেন্ট হাউসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু কোনো বৈঠক শেষেই উপস্থিত সাংবাদিকদের কিছুই বলা হয়নি।




