বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র সংযুক্ত হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। আরও ২ হাজার কোটি টাকা করে অতিরিক্ত চাওয়া হয়েছে।
নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখা, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকালীন চাহিদা মোকাবিলা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এ অর্থ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ। সম্প্রতি অর্থ বিভাগের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন উৎপাদন ইউনিটগুলোর বকেয়া পরিশোধ এবং প্রাথমিক জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে এই অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ ভর্তুকি বাবদ মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ইতোমধ্যে ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী অতিরিক্ত ভর্তুকি অনুমোদিত হলে মাসিক ব্যয় দাঁড়াবে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এতে পুরো অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান রাজস্ব আহরণের পরিস্থিতিতে এত বড় অঙ্কের ভর্তুকি জোগান দেওয়া কঠিন। তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়ায় বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কেন বাড়ছে ভর্তুকির চাপ
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০-এর আওতায় প্রতিযোগিতাহীনভাবে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় এবং উৎপাদন না থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার মতো শর্ত যুক্ত হওয়ায় ভর্তুকির চাপ দ্রুত বেড়ে যায়। এ কারণে এক পর্যায়ে বাজেট থেকে শুধু বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপরীতে ভর্তুকি দেয় অর্থ বিভাগ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সরকারি ও বেসরকারি উভয় উৎস থেকে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে। ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানই ভর্তুকি হিসেবে সরকারকে বহন করতে হয়। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। বাকি ৬০ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিপিডিবির নিজস্ব কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কেন্দ্রগুলোর
বিপরীতে ভর্তুকি না দেওয়ায় এ খাতে বকেয়া দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নতুন এ অধ্যাদেশের নাম ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪’।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী আগের আইনের অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারবে সরকার। তবে কোনো কেন্দ্র থেকে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে বলে মনে হলে, সেই দাম পুনর্বিবেচনা করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
তারা আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে কয়েকটি বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহের কারণে সে উদ্যোগ অগ্রসর হয়নি। তবে কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি আনতে পারলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হবে।
নিজস্ব কেন্দ্র ভর্তুকির আওতায় আনার প্রস্তাব
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, আইপিপি, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারত থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানি করে কম দামে বিক্রি করায় বিপিডিবি ধারাবাহিকভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। একইভাবে জিটুজি ভিত্তিতে যৌথ বিনিয়োগে স্থাপিত শ্রীপুর ১৬০ মেগাওয়াট এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্র, পটুয়াখালীর ১,৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র, মাতারবাড়ীর আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কেন্দ্রসহ সরকারি ও বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় ক্ষতি বাড়ছে।
এ ছাড়া গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাসের দাম ২০৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ঘনমিটার ৫ টাকা ২ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ৫০ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বিদ্যুৎ আমদানির ব্যয় আরও বাড়িয়েছে, বিশেষ করে ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নেপাল থেকে আমদানির ক্ষেত্রে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য মোট ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন, যা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ আমদানি এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত কেন্দ্রে ব্যয় হবে। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ‘পিক ডিমান্ড’ মোকাবিলায় ২ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে।
মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, সময়মতো অর্থ ছাড় না হলে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ ব্যাহত হতে পারে এবং আইপিপি ও আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধে বিলম্ব হবে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, প্রস্তাবটি সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় রয়েছে। তবে বর্তমান আর্থিক সংকোচন নীতির মধ্যে এত বড় অঙ্কের ভর্তুকি জাতীয় বাজেটের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করবে বলে তারা উল্লেখ করেছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম সমকালকে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো বা সরকার থেকে ভর্তুকি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। গত ১৫ বছর ধরে এই খাতে যে ব্যাপক লুণ্ঠন হয়েছে, তা বন্ধ করতে পারলেই বিদ্যুৎ খাতের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, অতীতে সরকার লুণ্ঠনকারী ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ করেছে বলেই তারা সুবিধাভোগী হয়েছে। বর্তমান সরকারের একই পথে হাঁটার কোনো কারণ নেই।
সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে গিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি চাপে পড়ছে এবং বাজেটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। প্রতিদিন জনগণের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হচ্ছে। এই প্রবণতা বন্ধ করা এখন সরকারের জন্য সময়ের দাবি।
সংকট মোকাবিলায় ৩০০ কোটি ডলার ঋণের চিন্তা
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। এলএনজির বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম যুদ্ধের আগের ব্যারেলপ্রতি ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে ১০০ ডলারে উঠেছে। আর প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১২ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি না করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জুন পর্যন্ত সরকারের প্রয়োজন হবে বাড়তি ৩০০ কোটি ডলার। এ অর্থ জোগাড় করতে সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ঋণ সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করেছে।
জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে কী পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন করেছে সরকার। এ ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে অর্থাৎ আগামী জুন পর্যন্ত ৩০০ কোটি ডলারের মতো অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এরই মধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়ে গেছে। অপ্রতুল রাজস্ব আয়ের কারণে সরকারের পক্ষে বাড়তি অর্থ ব্যয় করার সুযোগ সীমিত।
তারা জানান, জ্বালানি কেনার অর্থ পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। নিজেদের অর্থে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় মেটাতে গেলে রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে। এ কারণে সরকার আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও এআইআইবির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাড়তি অর্থের সংস্থান করতে চাইছে। আইএমএফের কাছ থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো সহায়তা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এডিবির কাছ থেকে বাড়তি ২৫ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে চাওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির কাছেও বাজেট সহায়তা চাওয়া হবে। সামনের মাসে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন অধিবেশনে এ বিষয়ে সংস্থা দুটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কথা বলবেন বলে জানা গেছে।




