Home Blog Page 134

‘কৃষক কার্ডে’ মিলবে ভর্তুকি, ঋণ, সেচসহ ১০ সুবিধা

দেশের কৃষি খাতকে ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। তিন ধাপে পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সব কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হবে ‘কৃষক কার্ড’। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ভর্তুকি, কৃষিঋণ, সেচ সুবিধা, কৃষি উপকরণসহ অন্তত ১০ ধরনের সেবা পাবেন। পাশাপাশি তৈরি হবে একটি সমন্বিত কৃষক ডেটাবেজ, যা ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার।

এ ছাড়া প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। মোট ২২ হাজার ৬৫ জন তালিকাভুক্ত কৃষকের মধ্যে ২০ হাজার ৬৭১ জন এই সহায়তা পাবেন। সরকার বলছে, এটি সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মতো কাজ করবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কৃষকদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে। এই অর্থ শুধু কৃষি কাজে ব্যয় করা যাবে এবং এতে অন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পেতে কোনো সমস্যা হবে না।

আগামীকাল পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন।

তিন ধাপের রোডম্যাপ

কৃষিমন্ত্রী জানান, ‘কৃষক কার্ড’ প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে– প্রাক-পাইলটিং, পাইলটিং এবং দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। প্রথম ধাপে প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম চালু হচ্ছে ১০ জেলার ১১টি উপজেলায়, ১১টি কৃষি ব্লকে। এই পর্যায়ে সীমিত আকারে প্রকল্পটি চালিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া হবে। এখানে শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকই নন, বরং মৎস্যচাষি, আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খামারি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ কৃষিকে একটি সমন্বিত খাত হিসেবে বিবেচনা করে কার্ড ব্যবস্থাটি তৈরি করা হচ্ছে। প্রাক-পাইলটিং শেষে আগামী আগস্ট পর্যন্ত ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম চালু করা হবে। এরপর পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করে পর্যায়ক্রমে চার বছরের মধ্যে সারাদেশে এই কার্ড বিতরণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষক তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রথম ধাপে ২২ হাজার কৃষক

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ইতোমধ্যে ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই তালিকায় ভূমির পরিমাণ অনুযায়ী পাঁচটি শ্রেণিতে কৃষকদের ভাগ করা হয়েছে। ভূমিহীন কৃষক (৫ শতকের কম জমির মালিক) আছেন দুই হাজার ২৪৬ জন। প্রান্তিক কৃষক (৫ থেকে ৪৯ শতক) ৯ হাজার ৪৫৮ জন। ক্ষুদ্র কৃষক (৫০ থেকে ২৪৯ শতক) আট হাজার ৯৬৭ জন। মাঝারি কৃষক (২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক) এক হাজার ৩০৩ জন এবং বড় কৃষক (৭৫০
শতকের বেশি জমির মালিক) মাত্র ৯১ জন। পেশাভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, মোট তালিকাভুক্তদের মধ্যে ২১ হাজার ১৪১ জনই ফসল উৎপাদনকারী কৃষক। এ ছাড়া ৮৫৫ জন প্রাণিসম্পদ খামারি, ৬৬ জন মৎস্যজীবী এবং অল্পসংখ্যক লবণচাষি অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

নগদ সহায়তা, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রান্তিকদের

এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এই তিন শ্রেণির মোট কৃষকের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন, যা মোট তালিকাভুক্ত কৃষকের বড় অংশ।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই নগদ সহায়তা একটি সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মতো কাজ করবে, যা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কৃষকদের উৎপাদন চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। তবে মাঝারি ও বড় কৃষকরা এই নগদ সহায়তার আওতায় থাকবেন না, যদিও অন্যান্য সুবিধা তারা পাবেন।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মতো, যে কৃষকদের নগদ সহায়তা দেওয়া হবে তারা সে অর্থ শুধু কৃষিকাজে খরচ করতে পারবেন। এই সহায়তার কারণে অন্য সামাজিক সুরক্ষার সহায়তা পেতে অসুবিধা হবে না।

এক কার্ডে ১০ সুবিধা

কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা যেসব সুবিধা পাবেন, তা কৃষি খাতকে সমন্বিত সেবা ব্যবস্থায় নিয়ে যাবে। কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে সার-বীজসহ কৃষি উপকরণ পাবেন। সেচ সুবিধা নিতে পারবেন ভর্তুকি মূল্যে। সহজ শর্তে কৃষিঋণ পাওয়া যাবে, যা উৎপাদন ব্যয় মেটাতে সহায়ক হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি স্বল্পমূল্যে পাওয়া যাবে, যা আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারে ভূমিকা রাখবে। সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি এই কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া হবে। মোবাইল ফোনে আবহাওয়া পূর্বাভাস ও বাজারদর সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছে যাবে কৃষকের হাতে। কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমনের পরামর্শ এবং কৃষি বীমা সুবিধাও এই কার্ডের আওতায় থাকবে।

প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় আট কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে কার্ড ইস্যু, তথ্য সংগ্রহ, ব্যাংকিং সংযোগ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথম ধাপে পঞ্চগড়, বগুড়া, ঝিনাইদহ, পিরোজপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মৌলভীবাজার ও জামালপুর জেলার নির্দিষ্ট ব্লকে এই কার্যক্রম চালু হচ্ছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তি

‘কৃষক কার্ড’ মূলত একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড, যা সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন।

স্থানীয় ডিলারের কাছে থাকা পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন ব্যবহার করে সার, বীজ, প্রাণিখাদ্য, মৎস্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমবে এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে।

চৈত্রসংক্রান্তি আজ অদেখা নতুনের দিকে এগিয়ে যাওয়া

আজ চৈত্রসংক্রান্তি। বছরের শেষ দিন। নতুন বছরের সঙ্গে যার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন। পুরোনো সময়ের ধুলো মুছে, অদেখা নতুনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার হাতছানি। ঋতু বদলায়, মাটি তার ভেতরে নতুন বীজের জন্য জায়গা করে দেয়। সেই অদৃশ্য পরিবর্তনের মুহূর্তটির নামই চৈত্রসংক্রান্তি।

বাংলা বছরের হিসাব চলে সূর্যের গতিপথ ধরে, একটি সৌরচক্রের ভেতর দিয়ে। সেই হিসাবে চৈত্র মাসের শেষ দিনটি কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক সঞ্চারপর্ব। ‘সংক্রান্তি’ শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এই গমন। এক কিনারা থেকে অন্য কিনারায় যাওয়া। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায়, আজ সূর্য মীন রাশি ছেড়ে মেষে প্রবেশ করছে। সনাতন পঞ্জিকায় তাই দিনটি ‘মহাবিষুব সংক্রান্তি’।

চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে প্রচলিত আলোচনা সাধারণত মেলা, গাজন বা চড়ক পূজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে আরও গভীর এক ভাবনা। নিজেকে, প্রকৃতিকে এবং সময়কে নতুন করে বোঝার চেষ্টা।

কৃষিনির্ভর বাংলায় চৈত্র ছিল অনিশ্চয়তার মাস। খরতাপে শুকিয়ে যাওয়া জমি, বৃষ্টির প্রতীক্ষা এবং ফসলের অপেক্ষা। সব মিলিয়ে মানুষের জীবন তখন প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় সূর্যের প্রতি প্রার্থনা, বৃষ্টির আহ্বান এবং নতুন বছরের প্রস্তুতি– সবই একসঙ্গে মিশে যায় চৈত্রসংক্রান্তিতে।

এই প্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গৃহস্থালির ভেতর খাদ্য প্রস্তুতি, ব্রত বা আচার। এসবের মধ্য দিয়ে নারীই হয়ে উঠতেন প্রকৃতি ও পরিবারের সংযোগরেখা। ফলে উৎসবটি কেবল বাহ্যিক নয়, ছিল এক গভীর জীবনচর্চা।

একসময় চৈত্রসংক্রান্তি মানেই ছিল গ্রামবাংলার প্রাণের উৎসব। গৃহস্থরা মেয়েজামাই ও নাতি-নাতনিদের আমন্ত্রণ জানাতেন, নতুন পোশাক দেওয়া হতো, কয়েক দিন ধরে চলত আপ্যায়ন। এই সময়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মেলা। যেখানে কুটিরশিল্প, মাটির খেলনা, লোকজ মিষ্টি আর বিনোদনের সমাহার ঘটত।

বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। শহুরে জীবনের প্রভাবে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারায় পরিবর্তন এলেও তা বিলীন হয়নি। গ্রামে ও বাজারে এখনও মেলা বসে। নতুন রূপে শহরেও বসছে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা। ঢাকা শহরজুড়ে চলে সাপ্তাহিক মেলা। রাজধানীর আশপাশে ও বিভাগীয় শহরগুলোও এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেলার পসরা সাজিয়ে বসে।

একদিকে লাঠিখেলা, সঙযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, আবৃত্তি; অন্যদিকে পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীদের হালখাতার প্রস্তুতি। দুটো দিক একত্রিত হয়ে এক সর্বজনীন সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

চৈত্রসংক্রান্তির অন্যতম দৃশ্যমান দিক হলো গাজন ও চড়ক উৎসব। শিবভক্ত সন্ন্যাসীরা মাসজুড়ে সাধনার পর এদিন কঠোর দেহকৌশলের মাধ্যমে ভক্তি প্রকাশ করেন। শূল ফোঁড়া, বাণ ফোঁড়া বা বড়শি গাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে ঘোরা– এসব আচার ধর্মীয় বিশ্বাসের চরম বহিঃপ্রকাশ। বহু শতাব্দী ধরে বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে এই অনুশীলন টিকে আছে এখনও।

চৈত্রসংক্রান্তির খাদ্যাভ্যাসেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। আজকের দিনে ১৪ রকম শাক খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। বিশেষত তিতা স্বাদের খাবার। যেমন– নিমপাতা, করলা বা গিমা শাক। মূলত অনাবাদি শাকগুলো একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া হয়। এই বিশেষ প্রচলনটি গ্রামাঞ্চলে এখনও টিকে আছে।

মূলত, শরীরকে নতুন ঋতুর জন্য প্রস্তুত করে বলে বিশ্বাস করা হয় এই খাদ্য প্রচলনের মধ্য দিয়ে। আবার কোথাও ছাতু, দই-চিড়া, আবার কোথাও নানা পিঠা ও মিষ্টির আয়োজন দেখা যায়। এই খাদ্যসংস্কৃতি আসলে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার এক প্রাচীন জ্ঞানচর্চা।

চৈত্রসংক্রান্তির সময়টিতে পার্বত্য অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীগুলোও বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসবে মেতে ওঠে। ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু– এই তিন উৎসব মিলিয়ে পরিচিত বৈসাবি নামে। এই উৎসবে নতুন পোশাক, ফুল দিয়ে ঘর সাজানো, পিঠা-পায়েস তৈরি এবং ‘পাঁচন’ রান্না করা হয়। সাংগ্রাইয়ের জলোৎসব কিংবা বিজুর ফুলবিজু-মূলবিজুর মতো আয়োজনগুলো আনন্দ ও বিশ্বাসের মেলবন্ধন তৈরি করে।

তাদের বিশ্বাস, তেতো ও মিষ্টির সংমিশ্রণে বছর শেষ করলে পুরোনো দুঃখ মুছে যায় এবং নতুন বছর শুভ হয়ে ওঠে।

সনাতন ধর্মমতে, চৈত্রসংক্রান্তি অত্যন্ত পুণ্যময় দিন। উপবাস, দান, ব্রত ও স্নান– এসবকে এই দিনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হয়। তবে চৈত্রসংক্রান্তি কেবল ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বাঙালির এক অসাম্প্রদায়িক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

অতীতে মুসলিম সমাজেও এদিন খোলা মাঠে সম্মিলিত প্রার্থনা বা শিরনি বিতরণের প্রচলন ছিল। যা এই দিনের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক চরিত্রকে নির্দেশ করে।

বাংলা সনের বর্তমান রূপের পেছনেও রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। মুঘল সম্রাট আকবর কৃষি ও খাজনা ব্যবস্থাকে সহজ করতে নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। তাঁর নির্দেশে জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ্‌ সিরাজী সৌর ও চান্দ্র পদ্ধতির সমন্বয়ে বাংলা সনের কাঠামো নির্ধারণ করেন। এর ফলে বৈশাখ বছরের প্রথম মাস এবং চৈত্র শেষ মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

চৈত্র সংক্রান্তিতে পাতে যেসব খাবার রাখতে পারেন

আগামীকাল চৈত্রসংক্রান্তি, মানে চৈত্র মাসের শেষ তারিখ। একইসঙ্গে বাংলা বছরের শেষ দিন। এরপরদিন নতুন বছরের যাত্রা শুরু হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তির খাবার ভিন্ন হয়ে থাকে। অমিল থাকলেও একটি জায়গায় সবাই এক, আর তা হলো এদিনে পাতে তিতা স্বাদের খাবার থাকে।

ধারণা করা হয়, তিতা স্বাদ জীবনের কষ্ট, দুঃখ বা তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রতীক। এই তিতা স্বাদের খাবার খেয়ে জীবনের সব স্বাদ (মিষ্টি, টক, তিতা) গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়াকে বোঝানো হয়। যাক সে কথা, এবারের চৈত্র সংক্রান্তিতে ঘরে কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করতে পারেন।

কাঁচা কাঁঠালের তরকারি
চৈত্র সংক্রান্তির আরেকটি উল্লেখোগ্য খাবার কাঁঠালের তরকারি। কাঁচা কাঁঠালের নানা অংশ দিয়ে এই তরকারি রান্না করা হয়।

গিমা শাক
গ্রামের গৃহিণীরা এ দিন গিমা শাক ও বেগুন দিয়ে তরকারি রান্না করেন। এ সব তরকারি খেতে দেওয়া হয় ব্রত পালনকারি নারীদের।

নিম পাতা
নিমপাতা ও চাল ভেজে এক সঙ্গে খাওয়া চৈত্র সংক্রান্তির পুরনো ধারা। অনেকের ধারণা, এই খাবার খেলে সারা বছর সুস্থ থাকা সম্ভব।

সজনের চচ্চড়ি
চৈত্র সংক্রান্তিতে অনেক বাড়িতে সজনে চচ্চড়ি রান্না হয়। তা দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়।

নিরামিষ তরকারি
ব্রত পালন করা নারীরা বিভিন্ন নিরামিষ তরকারি রান্না করেন। বিভিন্ন শাক দিয়ে এই রান্না করা হয়।

তিতা ডাল
চৈত্র সংক্রান্তির অন্যতম খাবার তিতা ডাল। এটিই এই উৎসবের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত খাবার।

নারকেল নাডু
এ দিন অনেক বাড়িতে নারকেলের নাডু বানানো হয়। অতিথি আপ্যায়নে চৈত্র সংক্রান্তির অন্যতম অনুসঙ্গ এই খাবার। চৈত্র সংক্রান্তিতে নকশী পিঠাও বানানো হয়।

তোমারই চলার পথে…

কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে নেই– এই কথাটি আমার মন মানতে চায় না। যেন হঠাৎ করেই সংগীতের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর গান শুনে বড় হয়েছি। তাঁর কণ্ঠ ছিল ঠিক ভোরের পাখি ডাকার মতো– স্বচ্ছ, প্রাণবন্ত আর হৃদয়ছোঁয়া। কিন্তু জীবনে দুবার তাঁকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, যা আমার কাছে আজও অমূল্য স্মৃতি হয়ে আছে।

কলকাতায় ‘অন্যায় অবিচার’ সিনেমার গানের রেকর্ডিংয়ে গিয়েছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল, যেন বিশাল এক সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আর আমি তার ক্ষুদ্র একটি ঢেউ মাত্র। সেখানে আমার গান শুনে তিনি যে প্রশংসা করেছিলেন, তা আমাকে একদিকে যেমন লজ্জিত করেছিল, অন্যদিকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিতও করেছিল। তিনি উপস্থিত সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মণকে বলেছিলেন, ‘সিনেমার জন্য আপনার নির্বাচন খুব ভালো হয়েছে, সুন্দর একটি কণ্ঠ পেয়েছেন। সাবিনা ইয়াসমিন খুব ভালো গেয়েছে।’ তাঁর মুখে এমন কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল, যেন শুকনো মাটিতে হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে।

ওই কাজটিতে কিশোর কুমারের সঙ্গে একটি যুগল গান ও একটি একক গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। হিন্দি ও বাংলা– দুই ভাষাতেই কাজ করেছি। কিন্তু যত বড় শিল্পীই হোন না কেন, আশা ভোঁসলের মতো এত সহজ-সরল মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। তিনি ছিলেন ঠিক নদীর জলের মতো– নির্মল, প্রবহমান এবং সবাইকে আপন করে নেওয়ার মতো উদার। তাঁর সঙ্গে কিছু সময় কাটালেই বোঝা যেত, তিনি কতটা মাটির মানুষ।
ঢাকায় তাঁর সঙ্গে আরেকটি স্মরণীয় সাক্ষাৎ আমার হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। একবার তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে তাঁর গান শুনতে গিয়েছিলাম। সামনে বসে তাঁর গান শুনছিলাম আর মনে হচ্ছিল, আমি যেন সুরের এক অদৃশ্য জগতে ভেসে যাচ্ছি। তাঁর কণ্ঠ ছিল ঠিক সন্ধ্যার নরম বাতাসের মতো– শ্রোতার মনকে ছুঁয়ে যায় নিঃশব্দে। পরে মঞ্চের পেছনে দেখা হলে তিনি বললেন, ‘তোমাদের গান খুব বেশি শোনার সুযোগ পাই না। তবে কিছু গান শুনেছি, খুব ভালো লেগেছে। তোমার কিছু গান শ্রোতার মুখেও ফিরে।’ তিনি প্রশংসা করেই যাচ্ছিলেন আর আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আমি কি সত্যিই এতটা প্রাপ্য?

তাঁর বহুমুখী প্রতিভার জন্য তিনি সর্বত্রই সমাদৃত ছিলেন। গণমাধ্যমে তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী গায়িকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আট দশকের বেশি সময় ধরে বিস্তৃত তাঁর কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় চলচ্চিত্র এবং অ্যালবামের জন্য অসংখ্য গান রেকর্ড করেছেন। তাঁর অর্জনের ঝুলি ছিল এক বিশাল আকাশের মতো, যেখানে তারার মতো জ্বলজ্বল করে অসংখ্য সম্মাননা।

চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ভারত সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ প্রদান করে সম্মানিত করে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে সংগীত ইতিহাসের সর্বাধিক রেকর্ডকৃত শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। শ্রেষ্ঠ মহিলা নেপথ্য গায়িকা হিসেবে রেকর্ড সাতটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে। এ ছাড়া তিনি দুটি গ্র্যামি মনোনয়ন পেয়েছিলেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন ঠিক এক বিশাল বটগাছের মতো, যাঁর ছায়ায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম আশ্রয় পেয়েছে। তাঁর প্রয়াণে উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনে যেন এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
৯২ বছর বয়সে তাঁর এই বিদায় যেন একটি অধ্যায়ের অবসান। মনে হয়, সংগীতের আকাশে আজ এক চিরন্তন নীরবতা নেমে এসেছে। তবুও তাঁর গান রয়ে যাবে– ঠিক সকালের সূর্যের আলোর মতো, যা প্রতিদিন নতুন করে আমাদের হৃদয় আলোকিত করবে।

আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই– যেখানেই থাকুন, খুব ভালো থাকুন। আপনার সুর, আপনার কণ্ঠ, আপনার স্মৃতি– সবকিছু আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

ইরানি বন্দর অবরোধের ঘোষণা, ফের তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল

ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের মার্কিন ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। আজ লেনদেনের শুরুতেই এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

আজ সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল তেল ১০২ দশমিক ২৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা সফল না হওয়ায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মুক্তভাবে জাহাজ চলাচলের একটি চুক্তি হতে পারে। কিন্তু ইরানের বাধার কারণে তা হচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অবিলম্বে টোল দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে বের হওয়া সমস্ত জাহাজ আটকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, যে ওই অবৈধ টোল দেবে, সে নিরাপদে চলতে পারবে না। আর ইরান যদি মার্কিন বা অন্য কোনো জাহাজে হামলা চালায় তাহলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। পরে তিনি বলেন, ‘খুব শিগগিরই এই অবরোধ শুরু হবে।

এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়া শুরু করে। আজ সোমবার থেকে লেনদেনের শুরুতেই এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল তেল ১০২ দশমিক ২৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার। যুদ্ধের প্রভাবে বিভিন্ন সময়ে তা ১১৯ ডলারও ছাড়িয়ে যায়।

এর আগে, গত শুক্রবার পাকিস্তানে বৈঠকের খবরের মধ্যে জুনে সরবরাহের জন্য তেলের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ দশমিক ২০ ডলারে নামে।

কর্মশালায় আলোচকরা তামাক কর সংস্কারে ৮৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তর বর্তমান ৪টির পরিবর্তে ৩টিতে নামিয়ে আনা, প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের ওপর ৪ টাকা করে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করাসহ বাজেটারি বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাজেটের এসব সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলে বর্তমানের অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। এতে বিদ্যমান তামাক করের রাজস্বসহ মোট ৮৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব।

‘তামাক কর ও মূল্য পদক্ষেপ: বাজেট ২০২৬-২৭’ বিষয়ক এক কর্মশালায় রাজস্ব বাড়াতে এই আশাবাদ এবং তামাকের কর কাঠামো সংস্কারে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়। রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিএমএ ভবন মিলনায়তনে যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স (আত্মা)। কর্মশালায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান, আত্মা’র কনভেনর লিটন হায়দার, কো-কনভেনর নাদিরা কিরণ ও মিজান চৌধুরী, প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের, হেড অব প্রোগ্রামস মো. হাসান শাহরিয়ার প্রমুখ।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত তুলে ধরা হয় কর্মশালায়। এতে বলা হয়, তামাকবিরোধীদের বাজেট প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে, অকাল মৃত্যু কমবে এবং রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে।

কর্মশালায় জানানো হয়, বর্তমানে সিগারেট ব্যবহারকারীর অধিকাংশই নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের ভোক্তা, যারা মূলত দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ। নিম্ন এবং মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে দাম বাড়ানো হলে স্বল্প আয়ের মানুষ সিগারেট ছাড়তে বিশেষভাবে উৎসাহিত হবে। তরুণ প্রজন্ম ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। পাশাপাশি, সুনির্দিষ্ট কর-এর প্রচলন তামাক কর ব্যবস্থায় জটিলতা কমাবে এবং প্রশাসনিক সুবিধা বাড়াবে। নিম্ন স্তর এবং মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটর খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ; উচ্চ স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৪০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা নির্ধারণ; প্রিমিয়াম স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৮৫ টাকা থেকে ২০০ বা তদূর্ধ্ব টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। একইসঙ্গে খুচরা মূল্যের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের প্যাকেটের ওপর ৪ টাকা পরিমাণ সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়।

বিড়ি, জর্দা এবং গুলের ওপর এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত হারে সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয় কর্মশালায়। এছাড়া সকল তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়। এই সংস্কার করা হলে আগামী অর্থ বছরে তামাক কর ও মূল্য প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে তামাক খাত থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার অধিক রাজস্ব আয় অর্জিত হবে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় চুয়াল্লিশ হাজার কোটি টাকা বেশি। পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং তিন লাখ বাহাত্তর হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে এক লাখ পঁচাশি হাজার তরুণসহ তিন লাখ সত্তর হাজারের অধিক মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।

সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন বিএনপির দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ১২০০ ছাড়িয়েছে

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা ১২০০ ছাড়িয়েছে। গত তিন দিনে রাজধানীর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন নেত্রীরা। রোববার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার শেষ দিন থাকলেও এই সময়ের মধ্যে ৯ শতাধিক ফরম জমা পড়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামীকাল সোমবারও মনোনয়ন ফরম জমা নেওয়া হবে।

বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত তিন দিনে ১২ শতাধিক মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে ফরম পূরণ করে জমা দিয়েছেন ৯ শতাধিক নেত্রী। আজ বিকেল ৫টা পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম জমা নেওয়ার কথা থাকলেও এদিন রাত ৯টা পর্যন্ত জমা নেন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।

এদিকে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ১০ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমা নেয় বিএনপি। এতে রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে আসা দলীয় নেত্রীর পাশাপাশি শিক্ষক, আইনজীবী, শিল্পী, উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা মানুষ মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন।

দীর্ঘদিনের ত্যাগী হেভিওয়েট নেত্রীর পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখ। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা নেই, এমন অনেকের মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়া নিয়ে নেতাকর্মীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। ত্যাগী নেত্রীরা বলছেন, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের উপেক্ষা করা হলে সংগঠনের ভিত দুর্বল হতে পারে।

এদিকে রোববার দুপুরে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এবার সংগঠন করার দক্ষতা, মেধা ও মননশীলতা– সব মিলিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। দলে সেলিব্রিটি আসা অস্বাভাবিক নয়। তবে তাদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বের বহু দেশে সেলিব্রিটিরা রাজনীতিতে আসেন।

তিনি আরও বলেন, মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও একজন বড় শিল্পীর রাজনৈতিক সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, সবাইকে কি রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে? একজন বিখ্যাত শিল্পী যদি দলের পক্ষে অবস্থান নেন, সেটাও বড় অবদান। কিছু ক্ষেত্রে সেলিব্রিটি প্রার্থীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করা হয়েছে, যা দলে গ্রহণযোগ্য নয়।

এলপিজির সংকট ও চড়া দামে ভোগান্তিতে সাধারণ গ্রাহক কৈলাশটিলা গ্যাস প্লান্ট

সিলেটের গোলাপগঞ্জে এলপি গ্যাসের সরবরাহ সংকট এবং সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক বাজারমূল্যের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহক। তারা বলছেন, বৈশ্বিক জটিলতার কারণে একদিকে জ্বালানি তেলের সংকট, অন্যদিকে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন।

স্থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ, এলপিজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে বাজার সিন্ডিকেটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক সময় স্থানীয় কৈলাশটিলা গ্যাস প্লান্ট থেকে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ করা হতো। তখন বাজার সিন্ডিকেটের সুযোগ না থাকায় গ্রাহক ভোগান্তি ছিল না। বর্তমানে সেই সুযোগ নেই। সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে সরাসরি কোনো সরবরাহ না থাকায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বাড়ানো হয়েছে।

জানা গেছে, গোলাপগঞ্জে বিভিন্ন কোম্পানির ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার এক হাজার ৭৫০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্লান্ট সচল থাকলেও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ওই চক্র প্লান্ট থেকে সিলিন্ডার সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করছে এবং ব্যবসায়ীরা তা অধিক দামে বিক্রি করছেন। এতে করে এক সময় সাধারণ গ্রাহকের নাগালে থাকা এই প্ল্যান্টের গ্যাস এখন সিন্ডিকেটের পকেটে চলে গেছে। ফলে তারা ইচ্ছেমতো বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়চ্ছে বাড়তি মুনাফার জন্য।

ভুক্তভোগী একাধিক গ্রাহক জানান, আগে তারা সরাসরি প্লান্ট থেকে স্বল্পমূল্যে গ্যাস পেতেন। বর্তমানে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এতে সংসারের খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। চলমান সংকটে জর্জিত সাধারণ ভোক্তারা গত বুধবার কৈলাশটিলা প্লান্টের সামনে বিক্ষোভও করেন। সেখানে তারা সাধারণ গ্রাহকের জন্য সরাসরি সরকারি দামে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান।

উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শুধু স্থানীয় প্লান্টের গ্যাস নয়, বাজারে থাকা অন্যান্য কোম্পানির এলপিজি সিলিন্ডারও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। গ্রাহকদের কয়েকজন জানান, এক সময় উপজেলার মানুষ সরাসরি প্লান্ট থেকে গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে পারতেন। মাঝে হঠাৎ প্লান্ট বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবার ২০২৪ সাল থেকে প্লান্টটি চালু হলেও আগের মতো সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা আর চালু করা হয়নি।

এদিকে গ্যাস লাইন সংযোগের প্রতিশ্রুতি নিয়েও ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে। উপজেলার কয়েক হাজার পরিবার গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন ও নির্ধারিত ফি জমা দিলেও দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরেও সংযোগ প্রাপ্তির কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ভুক্তভোগীরা দ্রুত সংযোগ প্রদান এবং জমা দেওয়া অর্থের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে একটি সিন্ডিকেট এলপিজি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

গোলাপগঞ্জে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট নিরসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তারা কৈলাশটিলা গ্যাস প্লান্ট থেকে সরাসরি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত, বাজার মনিটরিং জোরদার এবং অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাপগঞ্জের কৈলাশটিলা এলপিজিসিএলের উপব্যবস্থাপক (প্রকৌশলী) আব্দুল মুমিন খান বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের নির্দেশে স্থানীয়ভাবে গ্রাহক পর্যায়ে সরাসরি সিলিন্ডারে গ্যাস বিক্রি বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া এই প্লান্ট পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা গ্রুপের ডিলারদের মাধ্যমে সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। গত বুধবার স্থানীয়রা আন্দোলন করেছে সেটা শুনেছেন। কিন্তু তাঁর কাছে কোনো ব্যাপারে কেউ যায়নি।

কৈলাশটিলা গ্যাস প্লান্টের একটি সূত্র জানায়, সরাসরি গ্যাস সরবরাহ করা হলে সে ক্ষেত্রে সহজলভ্যতার কারণে প্রচুর অপচয় হয় গ্রাহক পর্যায়ে। আবার কোম্পানির মাধ্যমে বাজারে গ্যাস সরবরাহ করার প্রক্রিয়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে ভোগান্তি হয় ভোক্তাদের।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের মতো সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয়। তবে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারমূল্য নাগালের মধ্যে রাখা গেলে গ্রাহকরা স্বস্তি পাবেন। এ ব্যাপারে সরকারের বিশেষ নজরদারির কথাও বলা হয়েছে।

জ্বালানি সংকট পালা করে চলছে পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি তেলের সংকটের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দেশের নৌপরিবহন খাতে। চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ নৌযান বসে থাকছে। বাকিগুলো চালাতে হচ্ছে পালা করে। এতে যাত্রীসেবার চেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়। সারাদেশে পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ডিজেলের সরবরাহ সীমিত হয়ে গেছে। ডিপো থেকে চাহিদার অর্ধেকের বেশি তেল সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে পণ্য পরিবহনের গতি কমে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যগুলোতে নৌ চলাচল অনেক কমে গেছে।

পাশাপাশি সারাদেশে ৪০টির লঞ্চের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক বন্ধ হওয়ার পথে বলে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। রাজধানীর চিত্রও প্রায় একই রকম। ঢাকার সদরঘাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৮টি নৌপথে রোটেশনের মাধ্যমে লঞ্চ চলাচল করতে হচ্ছে। কোনো কোনো রুটে ট্রিপ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা।

লঞ্চ মালিকদের সংগঠনের তথ্যমতে, সারাদেশে লঞ্চ চলাচলে চার লাখ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। লঞ্চ মালিকরা বলছেন, সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে নৌপথে যাত্রী সংকট। তাই আগে থেকেই নৌরুটগুলোতে লঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সংকট হওয়ায় আরও ধস নেমেছে এই খাতে। পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটলে স্থায়ীভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারেন অনেকে।

বন্দর পরিস্থিতি

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বেসরকারি অপারেটর ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মালিকানাধীন প্রায় আড়াই হাজার লাইটার জাহাজ চলাচল করে দেশের বিভিন্ন নৌপথে। এগুলো পরিচালনার জন্য দৈনিক গড়ে প্রায় আড়াই লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু ৫০ হাজার লিটারের মতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিআইডব্লিউটিসিসি) সূত্র জানায়, জ্বালানি তেল সংকটের কারণে জাহাজ পরিচালনার দৈনন্দিন পরিকল্পনাও ব্যাহত হচ্ছে। সংস্থাটির অধীনে থাকা প্রায় এক হাজার ৫০টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারাদেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহন করে থাকে। দৈনিক ৮০টি জাহাজ পণ্য পরিবহনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিদিন বরাদ্দ সভা করে জাহাজ নির্ধারণ করা হতো। কিন্তু তেল সংকটের কারণে দুদিন পরপর বরাদ্দ সভা করা হচ্ছে। যেসব জাহাজ তেল পাচ্ছে, পালা করে সেগুলোকে পণ্য পরিবহনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে গভীর ড্রাফটের বিদেশি বড় জাহাজ নোঙর করার পর সেখান থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করা হয়। বন্দরের বহির্নোঙরে পণ‍্য খালাসের এই কাজে নিয়োজিত ১০০ থেকে ১৫০ লাইটার জাহাজ। এখান থেকে পণ‍্য নিয়ে দেশের ৫২টি ঘাটে যায় আরও পাঁচ শতাধিক লাইটার। এসব ছোট জাহাজে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা আছে। কিন্তু মিলছে ৬০ হাজার লিটারের মতো। পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দরে আসা বিদেশি বড় জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বহির্নোঙরে। এই অপেক্ষার জন‍্য প্রতিদিন তাদের ক্ষতি গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে ২০ হাজার ডলার বা ২২ লাখ টাকা। বন্দরের বহির্নোঙরে গতকালও এমন বড় জাহাজ ছিল অর্ধশত।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ‍্যের ৭০ শতাংশের বেশি খালাস করা হয় বহির্নোঙরে। জেটিতে ড্রাফট কম থাকায় বড় জাহাজগুলো সেখানে লাইটারের মাধ‍্যমে পণ‍্য খালাস করে। চাহিদামতো লাইটার জাহাজ না মেলায় তার প্রভাব পড়ে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে। ক্ষতির মুখে পড়ে জাহাজ মালিক ও আমদানিকারকরা।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মাধ্যমে লাইটার জাহাজের বুকিং নেওয়া হয় প্রতিদিন। শিল্প মালিকদেরও লাইটার জাহাজ আছে। তারা নিজেদের পণ্য আনা-নেওয়া করতে সেগুলো স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করে। লাইটার জাহাজ দিয়ে বন্দরের বহির্নোঙর থেকে পণ‍্য নেওয়া হয় চট্টগ্রামের বেসরকারি ১৬টি ঘাটে। পণ‍্য যায় নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, নিতাইগঞ্জসহ দেশের ৫২টি ঘাটে। চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যায় এগুলোতে। নেওয়া হয় সিমেন্ট ক্লিংকার, কয়লাসহ শিল্পকারখানার কাজে ব‍্যবহৃত কাঁচামালও। সারাদেশে সচল থাকা এমন লাইটার জাহাজ আছে সহস্রাধিক।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র মিউচুয়াল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ বলেন, চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পাচ্ছি আমরা। অথচ নৌ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করতে হয় আমাদেরই। চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়াতে প্রত্যাশা অনুযায়ী দিতে পারছি না বুকিং। এতে পুরো বাণিজ‍্য বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

লঞ্চ পরিস্থিতি

লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মার্চের শুরু থেকে তেল সংকট দেখা দেওয়ায় ঈদুল ফিতরের সময় নৌপথে ঘরমুখো যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারেননি তারা। সংকট সমাধানে নৌপরিবহন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ছাড়াও নৌপথে তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়ামের নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপো কর্তৃপক্ষকে জরুরি চিঠি দিয়েছিল লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থা এবং নৌযানে তেল সরবরাহকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু সংকট নিরসন হয়নি। তাই ঈদের সময়ই রাজধানীর সদরঘাট টার্মিনালসহ বিভিন্ন টার্মিনাল ও লঞ্চঘাট থেকে কয়েকটি রুটের চলাচল বাতিল করতে হয়।

ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৮টি রুটে চলাচলকারী ১৪০টি আন্তঃজেলা ও ছোট-বড় লঞ্চ চলাচল করে। লঞ্চ মালিকদের দুটি সংগঠনের অধীন চলাচলকারী এসব লঞ্চের ডিজেলের চাহিদা রয়েছে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ভৈরব, আরিচা ইত্যাদি লঞ্চ টার্মিনাল অথবা ঘাট থেকে চলাচলকারী লোকাল (স্থানীয়) অর্ধশতাধিক লঞ্চের জন্য ডিজেলের চাহিদা প্রতিদিন এক লাখ লিটারের মতো। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে সদরঘাটের ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় ৬০ ভাগ ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।  অন্যান্য জায়গায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।

এরই মধ্যে সদরঘাট ছাড়াও বেশ কয়েকটি লঞ্চ টার্মিনাল ও ঘাট থেকে আন্তঃজেলা ও লোকাল লঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে পাঁচটি ও বরিশাল থেকে চার থেকে ছয়টিসহ ৪০টির মতো স্থানীয় ও ছোট লঞ্চের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল সমকালকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে প্রায় এক মাস ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না তারা। কোথাও কোথাও চাহিদার অর্ধেক তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে স্থানীয় পাওয়ার টিলারের তেলের ডিলারসহ খুচরা দোকান থেকে ডিজেল কিনে লোকসান দিয়ে হলেও যাত্রীসেবা চালু রাখার চেষ্টা করছেন। তেলের অভাবে অনেক রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে কয়েকটি রুটে চালু করা হয়েছে রোটেশন পদ্ধতি।

যাপের মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গত শনিবার জরুরি বৈঠক করেছে তাদের সংগঠন। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির এই বৈঠকে ঈদুল আজহার সময় আগামী জুনে তেল সংকট আরও বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মালিকরা। কেননা সে সময় সারাদেশে তেলের চাহিদা পাঁচ লাখ লিটার ছাড়াবে। এই কারণে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদুল আজহায় আগাম সতর্কতা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে চিঠি দেবেন তারা।

ঢাকা-বরিশাল রুটের সুন্দরবন নেভিগেশনের মালিক আকতার হোসেন বলেন, রাউন্ড ট্রিপে (যাওয়া-আসা) একটি লঞ্চে ছয় থেকে সাত হাজার লিটার তেল লাগে। নিয়মিত চলাচলকারী তিনটি লঞ্চে দৈনিক গড়ে ১৮ থেকে ২১ হাজার লিটার তেল লাগলেও বর্তমানে ১২-১৪ হাজার লিটারের বেশি পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে রোটেশন করে একটি বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। সংকট না কমলে লঞ্চ চালানো অব্যাহত রাখতে পারব কিনা সন্দেহ হয়।

ঢাকা-ভোলা রুটে চলাচলকারী গ্রিনলাইন ওয়াটার ভেসেলের জিএম আবদুস সাত্তার বলেন, প্রতিদিন তাদের দুটি ওয়াটার বাস চলাচল করে এই রুটে। জ্বালানি সংকটের কারণে ঈদের আগে-পরে একটি ওয়াটার বাস চালাতে হয়েছে তাদের। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজ চালানো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশেনের সভাপতি জি এম সরোয়ার বলেন, ডিপো থেকে তেল পাওয়ার পর অ্যাসোসিয়েশনের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৬-১৭টি মিনি ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে লঞ্চগুলোতে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। নিয়মিত চলাচলে সদরঘাট থেকে দেশের ৩৮টি রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর প্রতিদিন দরকার পড়ে দুই-তিন লাখ লিটার ডিজেল। কিন্তু ডিপো থেকে এই চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল পাচ্ছি আমরা। এ নিয়ে ঈদুল ফিতরের আগে ডিপো কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। তারপরও বাড়েনি তেল সরবরাহ। সংকট না কাটলে আমাদের পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপোর সুপারভাইজার জালাল উদ্দিন বলেন, নৌপরিবহনসহ সব খাতে জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনের বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।

সুনামগঞ্জের দেখার হাওর হাজারো কৃষকের চেষ্টায় বাঁধ রক্ষা

হাজারো কৃষকের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় আপাতত রক্ষা পেল সুনামগঞ্জের দেখার হাওর। গতকাল শনিবার সকালে পানির তোড়ে ভেঙে যায় গুজাউনি এলাকার এ বাঁধ। কৃষকদের চার ঘণ্টার প্রাণান্তকর চেষ্টায় রক্ষা
পেল লাখো মানুষের প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে সদর উপজেলা, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার মানুষের জমি আছে। এই হাওরে মোট জমির পরিমাণ ৪৫ হাজার ৮৫৯ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমি আছে ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর। হাওরে এবার অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ঝাওয়া, শেয়ালমারা, গুমরাসহ কয়েকটি জায়গায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, দেখার হাওরের ভেঙে যাওয়া গুজাউনি বাঁধে বাঁশ পুঁতে, মাটি-বন ও বালুর বস্তা স্রোতের মধ্যে ফেলে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করেন শত শত কৃষক। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো কৃষক তাতে যুক্ত হলেন। সকলের চেষ্টায় একপর্যায়ে মহাবিপদ থেকে রক্ষা পায় দেখার হাওর।

গুজাউনি বাঁধের প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে জনসবতি নেই, কেবল ধানের জমি এবং বিল। বাঁধ রক্ষার জন্য দূরের গ্রাম থেকে আসছিলেন কৃষকরা। কারও কাঁধে বাঁশ, কেউ বা কোদাল, কেউ টুকরিসহ বাঁধ রক্ষার কাজে যার কাছে যা আছে সঙ্গে নিয়ে বাঁধের দিকে আসছেন।

এই হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান নিয়ে গেল এক সপ্তাহ ধরে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন কৃষকরা। তারা বলেছেন, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হাওরের সবচেয়ে বড় বাঁধ উতারিয়া এখন তাদের গলার কাঁটা হয়েছে। এই বাঁধের কারণে গেল কয়েক দিনের বৃষ্টিতে দরিয়াবাজ অংশের ফসল ডুবে গেছে। শনিবার হাওরের গুজাউনি বাঁধ ভেঙে আরেকাংশ (মেলাউনি হাওর) ডুবতে থাকে। আপাতত বাঁধের ভাঙন ঠেকানো গেলেও একাংশে জলাবদ্ধতার যে পরিমাণ পানি আটকা আছে, তাতে অপরাংশ রক্ষা করা কঠিন জানিয়েছেন কৃষকরা।

হাওরসংলগ্ন মদনপুরের কৃষক আমিন উদ্দিন বললেন, পূর্ব পাশে বড়দৈ বিল, এই বিলের আশপাশের জমি ডুবে গেছে জলাবদ্ধতায়। ডান পাশের এক মেলানির হাওরেই তিন হাজার একর জমি আছে, ভাঙন ঠেকাতে না পারলে দেখতে দেখতে এই অংশ ডুবে যাবে। অপর হাওরেও পৌঁছাবে পানি।

কৃষকরা জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেখার হাওরের মাঝখানে গুজাউনি বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ শুরু হয় ডান দিকের জয়কলস, শান্তিগঞ্জ ও পশ্চিম পাগলা অংশের দেখার হাওরে। এ সময় কৃষকরা চিৎকার কান্নাকাটি শুরু করেন। চার ঘণ্টার চেষ্টায় বাঁধের ভাঙন রোধ এবং ভাঙা অংশ দিয়ে নিচের দিকে পানি নামা বন্ধ হওয়ার পর স্বস্তির খবর ছড়ায় হাওরতীরে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সুনামগঞ্জের সভাপতি ইয়াকুব বখ্‌ত বহলুল বলেন, ফসল কীভাবে রক্ষা করা যায় আরও ভাবতে হবে সকলের। যে বাঁধে হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি করে, তা দিয়ে লাভ কী হলো?
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, যে বাঁধটি ভেঙেছে সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফসল রক্ষা বাঁধের আওতায় ছিল না। বৃষ্টিতে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে বাঁধ কাটার খবর পাওয়া গেছে। এই বাঁধের বিষয়ে কৃষকদের পক্ষ থেকে আগে থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। আগে থেকে জানা গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো।