বিষণ্ণতা সবসময় হঠাৎ করে আসে না। অনেক ক্ষেত্রেই এটি নীরবে, ধাপে ধাপে মানুষের আচরণ ও মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটাতে থাকে। আমরা অনেক সময় এই পরিবর্তনগুলোকে ক্লান্তি, কাজের চাপ বা সাময়িক মনখারাপ ভেবে এড়িয়ে যাই। কিন্তু মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন কিছু আচরণই স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে একজন মানুষ ধীরে ধীরে বিষণ্নতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, বিষণ্নতা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্যতম বড় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা সময়মতো শনাক্ত না হলে ব্যক্তিগত জীবন, কাজের দক্ষতা এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের ছয়টি আচরণ দীর্ঘদিন ধরে দেখা দিলে তা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
প্রথমত, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
যে কাজগুলো একসময় আনন্দ দিত, সেগুলোর প্রতি হঠাৎ আগ্রহ কমে যাওয়া বিষণ্নতার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। প্রিয় গান, সিনেমা, বই বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছা না থাকলে এবং সবকিছুই নিরর্থক মনে হতে থাকলে এটি গভীর মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শক্তিহীনতা।
পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে, সামান্য কাজেই অবসন্ন বোধ হয়, তাহলে তা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ক্লান্তির ফলও হতে পারে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষণ্নতায় ভুগলে মস্তিষ্কের কার্যক্রম এমনভাবে প্রভাবিত হয় যে শরীর সবসময় শক্তিহীন মনে হয়।
তৃতীয়ত, ঘুমের ধরনে পরিবর্তন।
কেউ কেউ বিষণ্নতায় ভুগলে অতিরিক্ত ঘুমান, আবার কেউ রাতের পর রাত ঘুমোতে পারেন না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া, ভোরে জেগে ওঠা কিংবা অনিদ্রা বিষণ্নতার সাধারণ কিন্তু উপেক্ষিত লক্ষণ।
চতুর্থত, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া, ফোন ধরতে অনীহা, সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলা—এসব আচরণ ধীরে ধীরে মানসিক একাকীত্ব তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজের সমস্যার কথা কাউকে বলতে চান না, বরং নিজেকে আলাদা করে রাখেন।
পঞ্চমত, নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক ভাবনা।
বারবার নিজেকে অযোগ্য, ব্যর্থ বা অন্যদের জন্য বোঝা মনে হওয়া বিষণ্নতার একটি গুরুতর লক্ষণ। অতীতের ছোট ভুল নিয়ে অতিরিক্ত অনুশোচনা করা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশায় ভোগাও এই অবস্থার অংশ হতে পারে।
ষষ্ঠত, রাগ ও বিরক্তি বেড়ে যাওয়া।
বিষণ্নতা মানেই সবসময় চুপচাপ থাকা নয়। অনেকের ক্ষেত্রে সামান্য বিষয়েও রেগে যাওয়া, অস্থিরতা বা বিরক্তিভাব বেড়ে যায়। পরিবার বা সহকর্মীদের সঙ্গে অকারণে ঝগড়া হওয়াও বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে বলে জানান মনোবিজ্ঞানীরা।
কখন সাহায্য নেওয়া জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আচরণগুলো যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সময়মতো চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে বিষণ্নতা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। বরং নিজের পরিবর্তনগুলো চিনে নেওয়াই সুস্থ জীবনের প্রথম ধাপ। যদি নিজের বা কাছের কারও আচরণে এই লক্ষণগুলো দেখতে পান, তাহলে নীরবে সহ্য না করে সাহায্যের হাত বাড়ান।




