উচ্চাভিলাষী সংস্কার শুরুর এখনই সময় বাংলাদেশের

0
3

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসা একটি নতুন সরকারের জন্য উচ্চাভিলাষী সংস্কার শুরু করার এখনই সঠিক সময়। বাংলাদেশে রাজস্ব ও আর্থিক খাত সংস্কার এবং আর্থিক খাত পুনর্গঠন ও বিনিময় হার সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক কাজ করা প্রয়োজন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এমন মত দেন আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন। আইএমএফের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত মাসে বাংলাদেশ সফর করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ‘এশীয় ও প্যাসিফিক আউটলুক’-এর সারমর্ম উপস্থাপনায় কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীলতা এশিয়া অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এ অঞ্চলে নতুন জ্বালানি ধাক্কার নেতিবাচক প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলছে।
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে আইএমএফের পরিচালক বলেন, দুটি দেশেই আইএমএফ-সমর্থিত প্রোগ্রাম রয়েছে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে গত তিন বছরে তারা জিডিপির অংশ হিসেবে কর রাজস্ব বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। তারা ধীরে ধীরে ‘আর্থিক বাফার’ তৈরি করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য তারা এখন ভালো অবস্থানে আছে। শ্রীলঙ্কার জন্য মূল নীতি হলো, এই সহায়তাকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং সাময়িক করা, যাতে হাতের সম্পদগুলো দক্ষভাবে ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশের রাজস্বের ভিত্তি এবং রাজস্ব আদায় উভয়ই বেশ কম। ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিতে তারা অনেক বেশি হিমশিম খাচ্ছে।

তিনি বলেন, যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, তাই যে সম্পদই থাকুক না কেন, তা যতটা সম্ভব সুনির্দিষ্টভাবে ব্যবহার করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তাদের রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে, যা বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো করেনি। এটি বেশ কম এবং গত তিন বছরে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আদায় আরও কমেছে। এ ছাড়া আর্থিক খাতের অন্যান্য বাধাও তাদের বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে নিকটবর্তী ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা যায়।
বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানিতে আইএমএফ ঋণ দেবে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে শ্রীনিবাসন বলেন, এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ তারা প্রচুর জ্বালানি আমদানি করে। নীতি সহায়তা ও প্রোগ্রামগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা কাজ করছেন। আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
জ্বালানির মজুত কম থাকলে ঝুঁকি বেশি

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়া অঞ্চলের অর্থনীতি অত্যন্ত জ্বালানিনির্ভর। তেল ও গ্যাসের ব্যবহার অঞ্চলটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪ শতাংশ, যা ইউরোপের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কিছু দেশে, যেমন মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে, এই হার ১০ শতাংশেরও বেশি। এর ফলে জ্বালানির দামের সামান্য পরিবর্তনও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
এতে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সীমিত হওয়ায় এই অঞ্চলের দেশগুলোকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে হয়। সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলে তেল ও গ্যাস আমদানি জিডিপির প্রায় আড়াই শতাংশ। আইএমএফ মনে করে, এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ঝুঁকি মূলত নিম্নমুখী। যদি জ্বালানির দাম আরও বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ থাকে, তাহলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে যেসব দেশ আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারা উচ্চ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া যেসব দেশে জ্বালানির মজুত কম, আর্থিক সক্ষমতা সীমিত কিংবা রেমিট্যান্স, পর্যটন বা সার আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি, সেসব দেশে ঝুঁকি আরও বেশি।

বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি অনুযায়ী আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে ২০২৭ সালের মধ্যে বড় এশীয় অর্থনীতিগুলোর উৎপাদন প্রায় ০.৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আরও গুরুতর পরিস্থিতিতে এই ক্ষতি প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সুতরাং নীতিনির্ধারকদের জন্য স্বল্প মেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এই জ্বালানি ধাক্কা সামাল দেওয়া, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বাজারের সঠিক মূল্য সংকেত নিশ্চিত করা।
শ্রীনিবাসন বলেন, জ্বালানি ধাক্কার নেতিবাচক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবণতা এশিয়া অঞ্চলের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। ফলে জানুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় এশিয়ার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। এশিয়া এখনও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। তবে সামগ্রিকভাবে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৫ সালে যেখানে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ ছিল, তা ২০২৬ সালে কমে ৪.৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here