এনসিপির নিশানায় বিএনপির বিদ্রোহীরা

0
3

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির যেসব নেতা বহিষ্কৃত হয়েছেন, তাদের দলে টানার চেষ্টা করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে এই নেতাদের সমর্থন করায় যেসব নেতাকর্মী বিএনপি-ছাড়া হয়েছেন, এনসিপিতে এলে তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমর্থন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিএনপির দিক থেকে এনসিপিকে পাল্টা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর জোট ছাড়লে সহযোগিতা করা হবে। একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এ তথ্য সমকালকে নিশ্চিত করে বলেছেন, বিএনপির প্রস্তাব এনসিপি গ্রহণ করেনি।

সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে ঢাকার একটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া এক নেতার সঙ্গে এনসিপির আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে মামলা ও কারাবাসের জন্য আলোচিত এই নেতা বিএনপি থেকে স্থায়ী বহিষ্কার হয়েছেন। এনসিপি তাঁকে দলে ভিড়িয়ে রাজধানীতে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে চাচ্ছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ৭৮টি আসনে বিএনপির ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। তাদের সবাই বহিষ্কৃত হন দল থেকে। এর মধ্যে সাতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করে নির্বাচিত হয়েছেন। বহিষ্কৃত নেতাদের কয়েকজন বিএনপিতে ফেরার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে অন্তত একজনের সঙ্গে এরই মধ্যে এনসিপি যোগাযোগ করেছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে সংসদে মুলতবি প্রস্তাব আলোচনায় অংশ নিতে ওই এমপি সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। জামায়াত তাঁকে সুযোগ দেয়নি। তবে এনসিপি তাঁকে নিজেদের কোটা থেকে সময় দিয়ে সংসদে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করে।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সমকালকে বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী সবার জন্য এনসিপির দরজা খোলা। যারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসের কারণে বিএনপি থেকে বহিষ্কার হয়েছেন, তাদের এনসিপিতে নেওয়া হবে না। যারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসমুক্ত রাজনীতি করতে বিএনপি ছাড়তে চান, তাদের এনসিপিতে স্বাগত জানানো হবে। স্থানীয় নির্বাচনে সমর্থন দেওয়া হবে কিনা, তা জোট, দলে যোগ দেওয়া এবং তখনকার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর দখল, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ নানা অভিযোগে বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তিন হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বহিষ্কার হন এক হাজারের বেশি নেতা। এনসিপি দল বড় করতে গণহারে সবাইকে নেবে কিনা– এ প্রশ্নে আখতার হোসেন সমকালকে বলেন, আদর্শিক অবস্থানের কারণে যারা পুরোনো বন্দোবস্তের রাজনীতি করতে চান না, সংস্কার চান, গণভোটকে সম্মান করেন, তাদের জন্য এনসিপির দুয়ার খোলা।

‘জিয়া, খালেদার অনুসারীদের’ স্বাগত
গত শুক্রবার এক বৈঠকে এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তারের সিদ্ধান্ত নেন। চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয় মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের এমপি হাসনাত আবদুল্লাহকে। এর অংশ হিসেবেই পহেলা বৈশাখ বিকেলে চট্টগ্রামে বিএনপির সাবেক মেয়র মনজুর আলমের সঙ্গে দেখা করেন তিনি।

এ সাক্ষাতের খবর জানাজানি হওয়ার পর কয়েক যুবক মনজুর আলমের বাসার ফটকে অবস্থান নেন। তারা মনজুর আলমকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে হাসনাতকে প্রশ্ন করেন, একজন জুলাইযোদ্ধা হয়ে কেন তিনি আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় এসেছেন? মনজুর ও হাসনাত– উভয়ের ভাষ্য, সাক্ষাৎটি ছিল  সৌজন্যমূলক।

সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মনজুর আলম চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর ছিলেন। আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেলেও ২০১০ সালে মেয়র পদে প্রার্থী হন তাঁর এক সময়ের রাজনৈতিক গুরু ও দলের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে। বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সেই সময় মনজুর আলমকে মেয়র পদে সমর্থন দেন। নির্বাচনে জয়ী মনজুর আলম পরে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ পান। ২০১৫ সালের নির্বাচনেও বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ছিলেন মনজুর আলম। ভোটের দিন কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান মনজুর আলম। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তবে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি ধানের শীষের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালান। বিএনপির মেয়র শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে চট্টগ্রামে তারেক রহমানের জনসভার দিন তিনি সক্রিয় ছিলেন।

এর পরও বিএনপিতে ফিরতে না পারায় মনজুরকে দলে টানার চেষ্টা করছে এনসিপি। যদিও তিনি নিশ্চিত করেননি– চট্টগ্রামে মেয়র পদে এনসিপি সমর্থিত প্রার্থী হবেন কিনা। হাসনাত আবদুল্লাহ সমকালকে বলেন, এনসিপির সাংগঠনিক বিস্তারের জন্য অনেকের সঙ্গে কথা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবেই খালেদা জিয়ার একজন সাবেক উপদেষ্টা মনজুর আলমের সঙ্গে কথা হয়েছে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আদর্শের রাজনীতি যারা করেন, তাদের সঙ্গে এনসিপি কথা বলছে, বলবে। তারা কেউ এনসিপিতে এলে স্বাগত জানানো হবে।

বিদ্রোহীদের সমর্থকদের বিষয়েও আগ্রহ
গত সংসদ নির্বাচনের আগে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপি থেকে বহিষ্কার হন তিন শতাধিক নেতা। এর মধ্যে উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়নের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও রয়েছেন। তারা নির্বাচনের পর পদ হারিয়ে বিজয়ী এমপির সমর্থকদের চাপে রয়েছেন। কয়েক জায়গায় এমন বহিষ্কৃত নেতারা নির্বাচনকালীন সহিংসতার মামলায় আসামি হয়েছেন।

ময়মনসিংহের একটি উপজেলার বিএনপির বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক সমকালকে বলেন, পদ গেছে, তাঁর সমর্থিত প্রার্থীও হেরেছেন। এ কারণে নির্বাচনের পর এলাকায় থাকতে পারছেন না। নতুন এমপি ও সমর্থকদের মামলায় জড়িয়ে সব কূল হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগ আমলের সাড়ে ১৫ বছরেও এমন কোণঠাসা অবস্থায় ছিলেন না। এনসিপির নেতারা যোগাযোগ করে এলাকায় ফেরার জন্য সাহস দিয়েছেন। উপজেলা বা পৌর নির্বাচনে অংশ নিলে সমর্থন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

বিএনপি ছাড়তে চান না– জানিয়ে এ নেতা সমকালকে বলেন, পরিস্থিতি বিষয়ে উঠেছে নিজ দলের এমপির কারণেই। যাঁর পক্ষে নির্বাচন করেছিলেন, তিনি আর সেভাবে খবর রাখছেন না। সর্বমুখী চাপের কারণেই এনসিপির প্রস্তাব বিষয়ে ভাবতে হচ্ছে।

এনসিপির কয়েক জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনও তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে করতে চান। সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সংসদ নির্বাচনে পুরোপুরি জামায়াত-নির্ভর হতে হয়েছিল। এখন তারা সেই নির্ভরতা দূর করে নিজস্ব অবস্থান তৈরির জন্য তৃণমূলের অভিজ্ঞ, সাহসী নেতাকর্মী খুঁজছেন। শুধু তরুণদের দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। জীবিকার অনিশ্চয়তার কারণে তরুণরা সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে থাকতে চান না। তাই অন্য দলের পুরোনো নেতাকর্মীদের দিকে হাত বাড়াতে হচ্ছে।

এই নেতারা আরও বলেন, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে প্রার্থী হতে চান এমন অসংখ্য নেতা আছেন। নির্বাচন নির্দলীয় হলেও যারা দল এবং স্থানীয় এমপির সমর্থন পাবেন, তারাই এগিয়ে থাকবেন। বিএনপির বহু ত্যাগী নেতাকর্মী বঞ্চিত হতে পারেন। তাদের নির্বাচনে জোটের সমর্থন পাইয়ে দিয়ে এনসিপিতে টানা সম্ভব। আবার যোগদানের পদ্ধতির কারণে তারা জামায়াতেও যেতে পারবেন না।

এনসিপিও ‘প্রস্তাব’ পেয়েছিল
এনসিপির এক এমপি সমকালকে জানান, সরকারের দিক থেকে তাদের কাছেও প্রস্তাব এসেছিল। গত সপ্তাহে বিএনপির এক এমপি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রস্তাব করেন, জামায়াত জোট ছাড়লে সহযোগিতা পাবে এনসিপি। সরকারের সঙ্গে থেকে দল বিস্তারের সুযোগ পাবে।

এনসিপির একাধিক নেতা সমকালকে বলেন, এনসিপি নিজেদের গড়ে তুলতে বিরোধী দলের রাজনীতিই করতে চায়। সরকারের সঙ্গে থেকে অতীতে কোনো দলের রাজনীতি দাঁড়ায়নি। এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য এবং সংস্কারের দাবি পূরণে আগামী পাঁচ বছর সরকারের বিরোধিতায় উচ্চকিত থাকবে। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটের সম্পর্ক রাখা হবে; তা আদর্শিক পর্যায়ে নেওয়া হবে না। এ কারণে জামায়াত বিরোধিতা করলেও এনসিপি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিলে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞাকে সমর্থন করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here