দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায়। প্রকল্পটিতে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে রাশিয়া। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে এলেও রাশিয়াকে কীভাবে অর্থ পরিশোধ করা হবে, সেই সমস্যার সমাধান হয়নি। দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখে দেখেনি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মূল ঋণের বাইরে প্রাথমিক কাজের জন্য ৫০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল বাংলাদেশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এই ঋণ পরিশোধ শুরু করার কথা। কিন্তু রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে তা পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এর বাইরে রাশিয়া থেকে অন্য কিছু কেনাকাটার দায়ও মেটানো যাচ্ছে না। মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালে। ওই ঋণ পরিশোধের কিস্তি হবে বড় অঙ্কের। এ কারণে সমস্যাটির সমাধান আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে তারা আশা করছেন, ঋণ পরিশোধ শুরু করা না গেলেও রূপপুর প্রকল্পে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার কোনো ব্যাংক পেমেন্ট নিতে পারছে না। তাদের দায় পরিশোধের জন্য বিভিন্ন বিকল্প উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমাধানে আসা যায়নি। ফলে সোনালী ব্যাংকে আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলে রাশিয়ার পাওনা রাখা হচ্ছে।
সময়মতো অর্থ না পেলে জরিমানা আরোপের কথা বলেছিল রাশিয়া– এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, রাশিয়ার ঋণ পরিশোধ না করতে পারার সমস্যাটি বাংলাদেশের দিক থেকে নয়। তারাই অর্থ নিতে পারছে না। ফলে জরিমানা দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। রাশিয়াকে এমন অবস্থান জানানো হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ। প্রকল্প শুরুর সময় প্রতি ডলার ৮০ টাকা ধরে মোট ব্যয় ধরা হয় এক লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯১ হাজার কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার হলো রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণ। তবে পরে ডলারের দর সমন্বয়সহ অন্যান্য খরচ বেড়ে প্রকল্পের আকার দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, রাশিয়ার বিভিন্ন দায় পরিশোধের জন্য সোনালী ব্যাংকে তিনটি ‘এসক্রো’ হিসাব খোলা হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত এসব হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি ডলার জমা হয়েছে। এর মধ্যে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের জন্য জমা হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার। রাশিয়া থেকে অন্যান্য কেনাকাটার দায় পরিশোধ বাবদ অন্য দুটি হিসাবে জমা করা হয়েছে বাকি অর্থ।
জমা থেকে প্রকল্পের স্থানীয় ঠিকাদার বিল, সরবরাহকারী দায় পরিশোধসহ বিভিন্ন খাতে একটি অংশ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে পরিশোধযোগ্য দায় রয়েছে ১০২ কোটি ডলারের সামান্য বেশি।
ব্যাংকাররা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকলে অন্য দেশগুলো তার সঙ্গে লেনদেন করে না। এমনকি চীনের কোনো ব্যাংকও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কায় পরিশোধ নিষ্পত্তি করে না। এর প্রধান কারণ, অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিরাপদ অর্থ লেনদেনের বার্তা পাঠানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট)। এটি বিশ্বের সর্বাধিক দেশ ও ব্যাংকের ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিবছর কয়েক ট্রিলিয়ন অর্থ লেনদেন হয়। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর সুইফট থেকে রাশিয়াকে বাদ দেয় পশ্চিমা দেশগুলো। এ কারণেও রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন করা কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, সোনালী ব্যাংকের এসক্রো হিসাবে থাকা অর্থ নির্ধারিত সুদে বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়া তাতে রাজি হয়নি। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধ হলে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি হলে দেশটির পরিশোধ নিষ্পত্তি করা যাবে। এর বাইরে কোনো বিকল্প বাংলাদেশের কাছে নেই।
মূল ঋণ পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসছে
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। এই প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য নেওয়া ঋণের অর্থ পরিশোধ নিয়েই জটিলতা কাটেনি। মূল ঋণ পরিশোধের সময় যত এগিয়ে আসছে, উদ্বেগ তত বাড়ছে।
রূপপুর প্রকল্পের মূল ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের মার্চ থেকে। অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ পরিশোধ শুরুর সময় দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের মার্চে নির্ধারণের জন্য রাশিয়ার কাছে আবেদন করে। রাশিয়া ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কিস্তি পরিশোধ শুরুর সময় নির্ধারণ করেছে। আবার প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুনে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের সব প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই তাদের দায় পরিশোধ করা হবে। যখনই সুযোগ হবে, তারা অর্থ নিতে পারবে।
আগের যত উদ্যোগ
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ২০২২ সালে রাশিয়া চিঠি দিয়ে বাংলাদেশকে তাদের সব ধরনের পরিশোধ স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছিল। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পরের বছর পাওনা নিতে রাশিয়া আগ্রহ দেখায়।
সরাসরি অর্থ নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২৪ সালের এপ্রিলে রূপপুরসহ বিভিন্ন পাওনা পিপলস ব্যাংক অব চায়নার মাধ্যমে পরিশোধের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে একটি প্রটোকল চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। তবে সুইফট চ্যানেলে অর্থ দিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত আর তা কার্যকর করা যায়নি।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হিসাব খোলার বিষয়ে গত বছরের ৫ থেকে ১০ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সে দেশে যায়। সেখানে অ্যাকাউন্ট খোলার পাশাপাশি সুইফটের বিকল্প হিসেবে চীনের আন্তর্জাতিক লেনদেনের বার্তা প্রেরণের মাধ্যম দ্য ক্রসবর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমে (সিআইপিএস) যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোতে। আবার মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ থেকে। এ কারণে শেষ পর্যন্ত ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পাওনা নেওয়ার জন্য রাশিয়ার ‘এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট’-এর নামে এলসি স্থাপনকারী সোনালী ব্যাংকে কয়েকটি ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে অর্থ স্থানান্তরের প্রস্তাব দেয় রাশিয়া। প্রথমে সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে একই ব্যাংকের এফসি হিসাবে স্থানান্তর করে রাশিয়ায় নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। তবে সোনালী ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার সব ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্টই যুক্তরাষ্ট্র কিংবা দেশটির মিত্র দেশের সঙ্গে। যে কারণে এই উপায়ে পরিশোধ সম্ভব হয়নি।
রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ পুরোনো, বিশেষ করে দেশটি থেকে বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনা হতো। অনেক আগে থেকেই রাশিয়ার কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও তখন দায় পরিশোধের রাস্তা খোলা ছিল। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রয়েছে– এমন সব ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।




