দেশে খুনের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় সাজানো ও মিথ্যা মামলা দায়েরের মতো ঘটনা ঘটছে। কাউকে হয়রানি বা সামাজিকভাবে হেয় করা, অর্থ আদায়, রাজনৈতিক বিরোধ ও শত্রুতাবশত এসব মামলা করা হয়। চলে ‘মামলা বাণিজ্য’। প্রচলিত আইনে মিথ্যা মামলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য– দুটোই ফৌজদারি অপরাধ। এ জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও এই প্রবণতা বন্ধ হচ্ছে না। পক্ষান্তরে, কেউ ন্যায়বিচার পেতে মামলা করলেও সাক্ষ্য, আলামতের অভাবে অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না।
পুলিশ সপ্তাহের শেষ দিন গত বুধবার অপরাধবিষয়ক সম্মেলনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হত্যা মামলা তদন্তের চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ১০ বছরে পিবিআই সাত হাজার ৪২৭টি হত্যা মামলার তদন্ত করেছে। জেনারেল রেজিস্ট্রার বা জিআর হিসেবে এসব মামলার এজাহার (এফআইআর) সরাসরি থানায় করা হয়েছিল। সংস্থাটির তদন্ত করা ২২.৭১ শতাংশ হত্যা মামলায় প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিপরীতে খুন বা ইচ্ছাকৃত হত্যার ঘটনায় চার হাজার ১৭৫টি মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী পিবিআই চার্জশিট দাখিল করেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় অনেক মামলায় নিরপরাধ মানুষকে আসামি করে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ ওঠে। একেকটি মামলায় কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এ ধারা ১৭৩(এ) সংযোজন করে পরিপত্র জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর মাধ্যমে হয়রানিমূলক কারও নাম মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) অন্তর্ভুক্ত করা হলে তদন্ত কর্মকর্তার অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ও তা বিবেচনায় নিয়ে আদালতের অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়ার বিধান করা হয়েছে।
হত্যা মামলার চিত্র
পিবিআইর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সাত হাজার ৪২৭টি হত্যা মামলার তদন্ত করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে হত্যার অভিযোগে ৫৬ শতাংশ মামলায় ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এর অর্থ, এজাহার দাখিলের সময় যে অভিযোগ ছিল, তদন্তে সেই অপরাধের প্রমাণ মিলেছে। ৩০৬ ও ৩০৪(ক) বা অন্যান্য ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয় ৪৯৫টি মামলার। এ ছাড়া মিথ্যা অভিযোগে ১১৪টি, আইনগত ভুলে ২৩টি এবং তথ্যগত ভুলের জন্য এক হাজার ৫৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। অর্থাৎ ১ হাজার ৬৮৭টি মামলা প্রমাণ করা যায়নি।
এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধিতে (সিআরপিসি) ও পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) অনুযায়ী মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাঁচ ধরনের হয়ে থাকে। এগুলো হলো– চূড়ান্ত রিপোর্ট (সত্য), চূড়ান্ত প্রতিবেদন (মিথ্যা), চূড়ান্ত প্রতিবেদন (তথ্যগত ভুল), চূড়ান্ত প্রতিবেদন (আইনগত ভুল) ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন (আমল অযোগ্য)।
পিবিআই গত এক দশকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (তথ্যগত ভুল) দাখিল করেছে এক হাজার ৫৫টি মামলার। ঘটনার সত্যতা আছে, কিন্তু মামলা করার ক্ষেত্রে ভুল বা অজ্ঞতাবশত নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করা হলে, এমনকি ভুল তথ্য দেওয়া হলে তদন্ত কর্মকর্তা এ প্রতিবেদন দাখিল করেন।
চূড়ান্ত প্রতিবেদন (মিথ্যা) দাখিল করা হয়েছে ১১৪টি মামলায়। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয়– মামলাটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা; তখন এ প্রতিবেদন দেওয়া হয়। পিবিআইর তদন্তকৃত এক হাজার ৫৬৫টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (সত্য) দাখিল হয়েছে। কোনো মামলায় অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলেও চার্জশিট দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়া গেলে বা প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করা না গেলে এ প্রতিবেদন দেওয়া হয়। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহরুন রুনি হত্যা মামলাটির তদন্ত করছে পিবিআই। এ মামলায় খুনি শনাক্ত না হলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (সত্য) দাখিল করতে হবে।
এ ছাড়া ২৩টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন (আইনগত ভুল) দাখিল করা হয়েছে। ঘটনা সত্য, তবে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়নি বা আইনের দৃষ্টিতে মামলাটি চালানোর কোনো ভিত্তি নেই– এমনটি প্রমাণিত হলে এ প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
পিবিআইর প্রধান অতিরিক্ত আইজি মো. মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত একটি শিল্পের সঙ্গে তুলনীয়। দিনের পর দিন নিবিড়ভাবে এ তদন্ত করতে হয়। চাপ, সময় বেঁধে দিয়ে মামলার সঠিক তদন্ত সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার সততা, যোগ্যতার বিষয় যুক্ত। একটিতে বিচ্যুতি হলেই তদন্ত ভিন্ন দিকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
মোস্তফা কামাল আরও বলেন, ‘অনেকে বিভিন্ন কারণে প্রকৃত অভিযুক্তদের সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিদের জড়িয়ে মামলা করেন। আবার পৃথিবীর কোনো দেশ শতভাগ হত্যা মামলার ক্লু উদ্ঘাটন করতে পারে না। আমাদের এখানেও এ ধরনের মামলা রয়েছে। ঘটনা সত্য হলেও দেড় হাজারের মতো মামলার ক্লু পায়নি পিবিআই। কীভাবে হত্যা মামলার তদন্তের মান আরও বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে গত ১৬ এপ্রিল আইনমন্ত্রীর কাছে রুমিন ফারহানা জানতে চেয়েছিলেন, ‘বিগত ১৭ বছর এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মিথ্যা ও ভুয়া মামলার মধ্যে কত সংখ্যক মামলা তদন্তে বা আদালতের রায়ে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়েছে?’
জবাবে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, ‘মামলা দায়েরের সময় এজাহারে অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না। ফলে কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কতগুলো হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ভুয়া মামলাগুলোর মধ্যে কত সংখ্যক মামলা তদন্তে বা আদালতের রায়ে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে– তার সঠিক পরিসংখ্যান নিরূপণ করা সম্ভব নয়।’
আদালতে করা মামলার ৬২.৬৫% আসামি নির্দোষ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা (সিআর) ১৯৫টি মামলার তদন্ত করেছে পিবিআই। এতে ৮২টি মামলার অভিযোগ প্রমাণিত। এসব মামলায় মোট সাত হাজার ৬৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে দুই হাজার ৮৫৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত। চার হাজার ৭৯৫ জনের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ মোট অভিযুক্তের ৬২ দশমিক ৬৫ শতাংশ নির্দোষ।
পিবিআইপ্রধান মো. মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, ‘ওই সময় একটি বিশেষ পরিস্থিতি ছিল। এমন উদাহরণ আছে, একই ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। এখন দেশের কোথাও এ ধরনের মামলা করার সুযোগ নেই। অনেক যাচাই-বাছাই করে মামলা নেওয়া হয়।’
সঠিক তদন্তে যা করণীয়
পিবিআই তাদের মতামতে অজ্ঞাতপরিচয় কোনো লাশ উদ্ধারের পর কিছু করণীয় উল্লেখ করেছে। প্রথমে ক্রাইম সিন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। এরপর অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ রোধ করতে হবে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মৃতদেহের অবস্থান, পরিবেশ, সময় ও সাক্ষীদের বিবরণ তুলে ধরতে হবে। রক্ত, চুল, কাপড়, অস্ত্রসহ অন্যান্য বস্তুগত আলামত সঠিকভাবে সংগ্রহ করতে হবে। এসব সাক্ষ্য পরবর্তী সময়ে মামলা চলাকালে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর পর ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে দ্রুত জাতীয় ডেটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করতে হবে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠাতে হবে। আঘাতের ধরন, সময় নির্ধারণ ও ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। ডিএনএ প্রোফাইল করতে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠাতে হবে। এ ছাড়া তদন্তকালে প্রথমে জিডি করতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অপমৃত্যু বা নিয়মিত মামলা করতে হবে। মৃতদেহের ছবি সংগ্রহ করে দেশের সব থানায় বেতার বার্তা পাঠাতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা বা এ-সংক্রান্ত জিডি যাচাই করতে হবে।
লাশ শনাক্ত
২০১৯ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত অজ্ঞাত লাশ শনাক্ত করে ২২৮টি মামলা করেছে পিবিআই। এর মধ্যে ১৫৬টি পুরুষের লাশ, ৭২টি নারীর। গত সাত বছরে অজ্ঞাত লাশ শনাক্তের হার ২৭.৬৭ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে দুই হাজার ৩৪০টি লাশ শনাক্ত করা গেছে। শনাক্ত হয়নি ছয় হাজার ১১৬টি।
শাস্তির বিধান
ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারায় মিথ্যা অভিযোগে শাস্তির বিধান আছে। ম্যাজিস্ট্রেট যদি আসামিকে খালাস দেওয়ার সময় প্রমাণ পান– মামলাটি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক; বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন। দণ্ডবিধির ১৯১ ও ১৯৩ ধারায় মিথ্যা সাক্ষ্যদানের শাস্তির জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের কথা বলা আছে। দণ্ডবিধির ২০৯ ধারামতে, মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।
দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলার সাজা হলো দুই বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় ধরনের দণ্ড। যদি মিথ্যা মামলা কোনো মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সাত বছর বা তার বেশি মেয়াদের কোনো দণ্ডনীয় অপরাধ সম্পর্কে দায়ের করা হয়, তাহলে মামলা দায়েরকারী বা বাদী সাত বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এর সঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়েরকারীকে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ১৭ ধারাতেও মিথ্যা মামলা দায়েরের শাস্তির কথা উল্লেখ আছে।
এখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কারও ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে এই আইনের অন্য কোনো ধারায় মামলা করার জন্য আইনানুগ কারণ নেই জেনেও মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন অথবা করান, তবে সেই অভিযোগকারী অনধিক সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।




