প্রশাসনের বদলি, পদায়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তালগোল লেগে যাচ্ছে। সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধিদপ্তর ও সংস্থার প্রধান, এসপিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বদলি, পদায়ন কিংবা নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর বিতর্কের মুখে দুই মাসে অন্তত ১৫ জনকে প্রত্যাহার করছে সরকার। বাছাই প্রক্রিয়ায় ত্রুটি, তথ্যের ঘাটতি আর তাড়াহুড়া করে প্রজ্ঞাপন দেওয়ায় এ ঘটনা ঘটছে। এতে বিব্রত হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আবার সামাজিক মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর আলোচনা বা অন্যভাবে প্রভাবিত হয়ে নিয়োগ বাতিলের নজিরও রয়েছে। এ ছাড়া গত ২৬ এপ্রিল ১৫ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অধিদপ্তর-সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তাদের মধ্যে অন্তত সাত কর্মকর্তা বদলির আদেশ না মানার ধৃষ্টতাও দেখিয়েছেন।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এমন ঘটনা ঘটেছিল। ফলে পুরো প্রশাসনে ছিল অস্থিরতা। এসব কারণে সেই সময় আন্দোলনও করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সচিব ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিয়েও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আন্দোলন হয়েছে। কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে প্রজ্ঞাপন জারির পর দায়িত্ব নেওয়ার আগেই অন্তত আট ডিসির পদায়ন বাতিল করেছিল সরকার। নিয়োগের পরপরই সাত সচিবের পদায়ন বাতিল করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া পিএসসির ছয় সদস্যের নিয়োগ প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা ও যোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠায় ১১ দিনের মাথায় তাদের সবার নিয়োগাদেশ বাতিল হয়েছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে সে সময় চার উপদেষ্টা ও দুই সচিবের সমন্বয়ে গঠিত ‘জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটিও’ বাতিল করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এই কমিটি জনপ্রশাসনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন বিষয়ে পরামর্শ দিত।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রজ্ঞাপন হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে তা বাতিল করলে সরকারের দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়। এতে তৈরি হয় প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা। কর্মকর্তাদের মধ্যে দলাদলিও বাড়ে। এ জন্য ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। যেন পদায়ন বা নিয়োগের পর সমালোচনা হলেও পরিবর্তন করা না লাগে।
তারা বলেন, নিয়োগে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবকে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এরপর তারা মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সচিবকে সে তথ্য জানাবেন। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটাই চূড়ান্ত।
বিতর্কের মুখে প্রত্যাহার
আবদুর রশীদ মিয়াকে গত ২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। নিয়োগের পাঁচ দিন পর আবদুর রশীদ মিয়ার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আবদুর রশীদ মিয়ার অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গাজীপুরের বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক পদে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির দুদিনের মাথায় তা বাতিল করে কৃষি মন্ত্রণালয়। গত ৩ মে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনিসুর রহমানকে। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই সে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
গত ৫ মে দেশের ১২ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) পদে রদবদল আনা হয়। বিতর্ক তৈরি হওয়ায় তাদের মধ্যে তিনজনকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। গত ৯ মে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের আলাদা দুই আদেশে ফেনীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান ও পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর নিয়োগ দেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় মৌলভীবাজারের এসপি মো. রিয়াজুল ইসলামকেও প্রত্যাহার করা হয়। এসব আদেশে প্রত্যাহারের কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে তাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করে সংবাদ প্রকাশ হয়।
গত ২৫ মার্চ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক; বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তাদের পদে অন্য তিনজন সচিব নিয়োগ করা হয়। পরে এক দিনের মধ্যে এই তিন সচিবের বদলি আদেশ স্থগিত করে নতুন নিয়োগ পাওয়া তিন সচিবের আদেশ বাতিল করা হয়।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সমকালকে বলেন, সরকারের নিয়মেই নিয়োগগুলো হয়। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
সমালোচনায় বাতিল, তবু সমালোচিত নিয়োগ
গত ১০ মার্চ শিক্ষামন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান। এই নিয়োগের পর কয়েকজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুকে লেখেন, তিনি ১৭ বছর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেছেন। পত্রিকার লেখাগুলোও ফেসবুকে জুড়ে দেওয়া হয়। এরপর গত ১৪ মে তাঁর নিয়োগ বাতিল করা হয়। ওমর ফারুক দেওয়ান তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা। এরপরও তাঁকে একই দিন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তার পদ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠায় গত মঙ্গলবার ওমর ফারুক দেওয়ানের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পদে পদায়নের আদেশও বাতিল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা কোনো কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিষয়ে যাচাই-বাছাই করতে হবে। প্রয়োজনে নিতে হবে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন। সেই কর্মকর্তার বিষয়ে নেতিবাচক কোনো বিষয় থাকলে সেটা মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে জানাতে হবে।
জানতে চাইলে সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, আমি উপসচিব থাকার সময় একজন মন্ত্রী কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য ডিও লেটার দেন। ওই কর্মকর্তার বিষয়ে যাচাই-বাছাইয়ে কিছু নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যায়। এরপর সদয় অবগতির জন্য মন্ত্রীকে তা জানানো হয়।
সকালে আদেশ, বিকেলে বাতিল
এদিকে, গত সোমবার সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মিজানুর রশীদকে নির্বাহী পরিচালক (ইডি) পদে পদোন্নতি দেওয়ার পর বিকেল গড়াতেই সেই আদেশ বাতিল হয়ে যায়। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে তোলপাড় চলছে।
বদলি আদেশ মানছেন না অনেকে
গত ২৬ এপ্রিল পরিবেশ ও খাদ্য অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ), জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলসহ ১৫টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে পরিবর্তন আনে সরকার। নিয়োগ পাওয়া সবাই অতিরিক্ত সচিব। ওই ১৫ কর্মকর্তার মধ্যে সাতজন এখনও তাদের পদায়ন করা কর্মস্থলে যোগ দেননি। অথচ ওই পদগুলো শূন্য আছে। অধিদপ্তর ও সংস্থার প্রধান পদে বদলির প্রায় এক মাসেও যোগদান না করায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলের ৮১ ধারায় বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় বা বিভাগের বদলি আদেশের পর নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতির জন্য একজন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ছয় দিন সময় পাবেন। তবে একই শহরে বদলির আদেশ হলে প্রস্তুতির কোনো সময় পাবেন না।
বদলির পরও কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া কর্মকর্তারা হলেন– নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব দিল আফরোজা, পেটেন্ট, শিল্প নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এএসএম মুস্তাফিজুর রহমান, জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার আনোয়ার হোসেন।
এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রাজা মো. আবদুল হাইকে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক পদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু/কালভার্ট নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল পদে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাসান মাহমুদকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে তারা কেউ এখনও নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি।
এনটিআরসিএর কর্মকর্তারা জানান, রাজা মো. আবদুল হাই গত ৫ মে এখানে শুধু পরিচিত হতে এসেছিলেন। এরপর আর আসেননি। তবে রাজা মো. আবদুল হাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলতে পারেনি সমকাল।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এএসএম মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কর্তৃপক্ষ এখনও রিলিজ করেনি। তাই নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারিনি।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমান দপ্তরের কাজ শেষ না হওয়ার কারণে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারিনি। শিগগির যোগ দেব, তবে কত তারিখ সেটা বলতে পারছি না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, আমার আরও একটা প্রকল্পের দায়িত্ব আছে। এ জন্য সচিব ও ডিজি স্যার বলেছেন, ১ জুন আমাকে ছাড়পত্র দেবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাসান মাহমুদ বলেন, যোগদান না করার কোনো কারণ নেই। তবে আরও কিছু দিন পরে যাব।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বদলির নির্দেশনা না মানার অভিযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সমকালকে বলেন, বদলির ক্ষেত্রে কারও মতামত নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, যুগ্ম সচিব থেকে ওপরের পদে বদলির ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব দেয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।




